সোমবার, ১৫ অগাস্ট ২০২২, ০৩:০৩ অপরাহ্ন

হাতিরঝিল এখন অপরাধের স্বর্গরাজ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক, ই-কণ্ঠ টোয়েন্টিফোর ডটকম॥ দৃষ্টিনন্দন হাতিরঝিল। প্রতিদিন এখানে ছুটে আসেন হাজার হাজার দর্শণার্থী। কর্মব্যস্ততার ফাঁকে প্রকৃতির ছোঁয়া পেতে কেউ একাকী, কেউবা প্রিয়জনকে সঙ্গে নিয়ে আসেন। উপভোগ করেন হাতিরঝিলের মনোরম দৃশ্য। বিনোদনের এই কেন্দ্রটিতে এখন বাড়ছে অপরাধও। প্রতিদিনই ঢাকার অন্যতম এ বিনোদন কেন্দ্রে নানা ঘটনা ঘটছে। হাতিরঝিল এখন অপরাধের স্বর্গরাজ্য। প্রায়ই ঘটছে খুন, ছিনতাই, আত্মহত্যার মতো ঘটনা। এছাড়া মাদক বাণিজ্য, যৌন হয়রানি, দেহব্যবসা ও কিশোর গ্যাং উৎপাতের দেখা মিলছে অহরহ। প্রায় ঘটছে ছোট বড় দুর্ঘটনা।

বেপরোয়া হয়ে উঠেছে অপরাধচক্র। অপরাধীরা এই স্থানটিকে অপরাদের নিরাপদ স্থান হিসেবে বেছে নিয়েছে। হাতিরঝিল নির্মাণ থেকে শুরু করে উদ্বোধনের পর সেনাবাহিনী রক্ষণাবেক্ষণ কাজ করতো। তখন কেউ অপরাধ করতে সাহস পেতো না। সম্প্রতি রাজউকে তারা হাতিরঝিলের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়ার পরই অপরাধ বেড়ে গেছে। ২০১৩ সালের ২ জানুয়ারি হাতিরঝিল উদ্বোধন হয়। এরপর থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত এখানে অতন্ত ৬০ জনের বেশি সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। আহত হয়েছেন সহস্রাধিক।

এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তালিকায় আছে ব্যক্তিগত গাড়িও। করোনার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অতন্ত ৩০ জন। নেশাগ্রস্ত ও বেপরোয়া গতির কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। আত্মহত্যা করে প্রাণ হারিয়েছেন আরও অতন্ত ১০ জন। বন্দুকযুদ্ধের ঘটনাও ঘটেছে বেশ কয়েকটি। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৭ জন। বিভিন্ন সময় হাতিরঝিল থেকে পরিত্যক্ত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে আরও বেশ কয়েকটি।

সর্বশেষ গত ৮ জুন হাতিরঝিল থেকে বেসরকারি টেলিভিশন ডিবিসি নিউজের জ্যেষ্ঠ প্রযোজক আবদুল বারীর ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওইদিন সকাল ৭টার দিকে কনকর্ড প্লাজার উল্টোদিকে লেকের পাশে তার মরদেহ পাওয়া যায়। পুলিশ জানিয়েছে, গলা কেটে ও এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে তাকে হত্যা করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এ ঘটনার রহস্য উদঘাটন হয়নি। এদিকে চলতি বছরে ১৮ জানুয়ারি মধ্যরাতে হাতিরঝিলের বেগুনবাড়ি প্রান্তের সিদ্দিক মাস্টারের ঢালে সময়ের আলো পত্রিকার সাংবাদিক হাবীবুর রহমানের রক্তাক্ত দেহ পাওয়া যায়।

পরে এক পথচারী তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে হাবীবকে মৃত ঘোষণা করেন। ২৫ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার সকালে হাতিরঝিলে আসমা বেগম (৫০) নামের এক নারীর লাশ ভাসতে দেখেন স্থানীয়রা। পুলিশ এসে মরদেহটি উদ্ধার করে। আঙুলের ছাপ মিলিয়ে তার পরিচয় শনাক্ত করা হয়। ১৫ এপ্রিল দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে হাতিরঝিলের ব্রিজ থেকে পানিতে লাফ দিয়ে বজলু মিরাজ নামের এক যুবক আত্মহত্যা করে। ৩০ মে মগবাজার মধুবাগ সংলগ্ন হাতিরঝিল ওভার ব্রিজ থেকে নামার সময় ব্রিজের ঢালে আইল্যান্ডের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান শাহিন নামের আরেক যুবক। সম্প্রতি খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাতিরঝিলকে ঘিরে গড়ে উঠেছে অতন্ত ১৫টি ছিনতাইচক্র। দিনরাত প্রকাশ্যে ছিনতাইয়ে মরিয়া তারা। ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন বিভিন্ন স্থান থেকে ঘুরতে আসা লোকজন। এসব ছিনতাই কাজে অস্ত্রের পাশাপাশি ব্যবহার করেন মোটরসাইকেল ও প্রাইভেটকার। রাত হলেই বাড়ে তৎপরতা।

হাতিরঝিলের সঙ্গে সংযুক্ত অন্তত ৩৫টি চোরাগোপ্তা গলিতেই তাদের আনাগোনা। ছিনতাইয়ের কবলে পড়ে মারধর খেয়ে সর্বস্ব হারিয়েছেন অনেকেই। কেউ কেউ গুরুতর আহতও হয়েছেন। এছাড়া গলি ও বিভিন্ন বাসাবাড়ি ঘিরে জমে উঠেছে মাদক বাণিজ্য। প্রকাশ্যেই চলছে মাদক বেচাকেনা। লেকের পাড়ে বসেই মাদকদ্রব্য সেবন করা হচ্ছে। প্রকাশ্যে নারী ও পথচারীদের উত্ত্যক্ত করে তারা। ভয়ে কেউ প্রতিবাদ কিংবা মুখ খুলতে সাহস করছেন না। দিনের আলো নিবে আসলেই হাতিরঝিলে জমে উঠে নিশি কন্যাদের রাজত্ব। হাতিরঝিলের বেশি কিছু এলাকায় লাইট নষ্ট থাকায় সেখানেই তারা নানা অপকর্মে মেতে উঠেন। আলো স্বল্পতার সুযোগে কেউ কেউ আপত্তিকর কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে যাচ্ছে। মধ্যরাত হাতিরঝিল ব্রিজ ও ওভার ব্রিজগুলোতে চলে উচ্ছৃঙ্খল তরুণ-তরুণীদের বেলেল্লাপনা। মোবাইলে মিউজিক ছেড়ে অশালীন নৃত্যে নেচে-গেয়ে-ফুর্তি করছেন যুবক-যুবতীরা। এছাড়া কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত দিন দিন বেড়েই চলেছে। কেউ কেউ বাইক নিয়ে রেসিংয়ের প্রতিযোগিতায় নামছে। এতে দুর্ঘটনা বেড়েছে কয়েকগুণ।

সরজমিনে দেখা যায় কুনিপাড়া, বেগুনবাড়ী, মগবাজার অংশ, নয়াটোলা ব্রিজের দুই অংশে, পুলিশ প্লাজার পিছনের অংশ ও মেরুল বাড্ডা অংশের হাতিরঝিলে বখাটের উৎপাতে অতিষ্ঠ এখানকার মানুষ। কুনিপাড়া ও বেগুনবাড়ী অংশের বস্তিঘরগুলোর সঙ্গেই লাগোয়া রয়েছে ঝিলের রাস্তা-ফুটপাথ।

আছে অসংখ্য গলিপথ। এসব গলি দিয়ে হাতিরঝিলে প্রবেশ করছে উঠতি বয়সী কয়েকজন তরুণ। হাতিরঝিল ঢুকেই পথচারীদের লক্ষ্য করে শিস দিচ্ছে। ঘুরতে আসা তরুণ-তরুণীদের উদ্দেশ্যে অশালীন বাক্য উচ্চারণ করছে। অন্যদিকে বিভিন্ন স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েরা জোড়ায় জোড়ায় বসে গল্পে-আড্ডায় মেতে উঠেছে। তাদের অনেকের উচ্ছৃঙ্খল আচরণ, খোলামেলা পোশাকে রীতিমতো বিব্রত হচ্ছেন সাধারণ দর্শনাথীরা। তৃতীয় লিঙ্গের একদল পথচারীদের পথরোধ করে চাঁদা তুলছে। হাতিরঝিলে হকার প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকলেও সেখানে অনায়াসে বেচাবিক্রিতে ব্যস্ত তারা। উত্তরা থেকে হাতিরঝিলে ছেলেমেয়ে নিয়ে ঘুরতে আসা শিউলি বেগম বলেন, ঢাকায় ছেলেমেয়েদের অবসর কাটানোর জায়গা কম। তাই তাদের আবদারে হাতিরঝিল ঘুরতে আসা। তবে দু’বছর আগে যেমনটা দেখেছিলাম, এখন এর কিছুই নেই। ময়লা আবর্জনায় ভরা।

বসার জায়গাগুলো বখাটে টাইপের ছেলেরা বসে আড্ডা দিচ্ছে। কেউ কেউ তাস খেলেছে। স্কুল কলেজ ফাঁকি দিয়ে ছেলেমেয়রা বিনোদনের নামে নষ্টামি করছে। কেউ কাউকে বাধা দিচ্ছে না। হাতিরঝিল ঘুরতে এসে ছিনতাইয়ের শিকার হন নাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, আমার বান্ধবীকে নিয়ে ঝিলের পাশে বসেছিলাম। প্রথমে একটি ছেলে এসে আমাদের পাশে বসে। আশেপাশে লোকজন কম। শুধু গাড়ি যাচ্ছে। এরই মধ্যে কিছু বুঝে ওঠার আগেই কয়েকজন তরুণ একটা প্রাইভেটকার থেকে নেমে মানিব্যাগ ও মোবাইল দিতে বলে- সামনে ছুরি দেখায়। ভয়ে সব দিয়ে দেই। চিৎকার করলে গুলি করবে বলে হুমকিও দেয়। দ্রুতই তারা সটকে পড়ে। পরে জীবনের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে কাউকে কিছু বলিনি। হাতিরঝিল কারো জন্য নিরাপদ নয়। তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, হাতিরঝিল এলাকার অপরাধ বেড়েছে এমন কোনো পরিসংখ্যান নেই। প্রায় ৯৮ শতাংশ হাতিরঝিল এলাকা তেজগাঁও এর মধ্যে। তবে সম্প্রতি ডিবিসি’র প্রোডিউসারের মৃত্যুর ঘটনা যে এলাকায় হয়েছে তা গুলশান ডিভিশনের মধ্যে পড়ে। দুর্ঘটনার যে ঘটনাগুলো দেখছেন তা আমি দেখি না, সেটা ট্রাফিক দেখে। এমন কোনো ঘটনা পাবেন না যেখানে ঘটনা ঘটেছে কিন্তু পুলিশ এরেস্ট করেনি।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020  E-Kantha24
Technical Helped by Titans It Solution