সোমবার, ০৮ অগাস্ট ২০২২, ০৩:৩৪ পূর্বাহ্ন

সিএনজি অটোরিকশা মিটারে না চলাটাই যেন নিয়ম

স্টাফ রিপোর্টার,ই-কণ্ঠ টোয়েন্টিফোর ডটকম॥ সরকার নির্ধারিত মিটারের ভাড়ায় চলছে না রাজধানীতে চলাচলকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশা। এ অবস্থা দেখা যাচ্ছে দীর্ঘ দিন ধরে। এখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, মিটারে না চলাটাই যেন নিয়ম।

চালকদের কাছে অনেকটা জিম্মি যাত্রীরা বাধ্য হয়ে মৌখিক ভাড়ায় সিএনজিতে চলাচল করেন। এ নিয়ে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগেরও কোনো তৎপরতা দেখা যায় না আজকাল।একাধিক সিএনজি অটোরিকশার যাত্রীর সঙ্গে আলাপে জানা যায়, যে গন্তব্যে মিটারে ভাড়া আসে ১০০ থেকে ১২০ টাকা, সেখানে পৌঁছাতে চুক্তিতে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। চুক্তিতে যাত্রী তুলে চালকরা মিটার চালু করেই পথ চলেন বলেও জানান কেউ কেউ।

রাজধানী ঢাকায় ২০০২ সালের শেষ দিকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালু হয়। পরে সরকার মিটার বাধ্যতামূলক করে কিলোমিটারে ভাড়া সাত টাকা ৬৪ পয়সা এবং ওয়েটিং চার্জ এক টাকা ৪০ পয়সা নির্ধারণ করে দেয়। ২০১৫ সালে প্রথম দুই কিলোমিটারের ভাড়া ৪০ টাকা, পরের প্রতি কিলোমিটার ১২ টাকা এবং ওয়েটিং চার্জ মিনিটে দুই টাকা নির্ধারণ করা হয়।

কিন্তু সিএনজি অটোরিকশা চালকরা সরকার নির্ধারিত ভাড়া মেনে গাড়ি চালাতে বরাবরই অপারগতা দেখিয়েছেন। এ নিয়ে আগে প্রতিদিনই অভিযোগের কথা জানা গেলেও এখন বিশেষ করে উবার, পাঠাও ও বাইক রাইড শেয়ারিং জনপ্রিয় হওয়ার পর তা কমে এসেছে।যাত্রীদের কাছ থেকে সিএনজি চালকরা নিজেদের ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করেন। সড়কে নিরুপায় যাত্রীরা চুক্তিতে যেতেই বাধ্য হন। যদি কখনো কোনো চালক মিটারে যেতে রাজি হন, তাহলে মিটারের চেয়ে বাড়তি চাওয়া হয় অন্তত ৫০ টাকা।

সরেজমিনে চালকদের সঙ্গে আলাপ করে দেখা গেছে, অধিকাংশ অটোরিকশার মিটার অকেজো। নামকা ওয়াস্তে লাগিয়ে রাখা হয়েছে জরিমানা থেকে বাঁচার জন্য। সবুজ রঙের সব অটোরিকশায় মিটার থাকা বাধ্যতামূলক। মিটারে যাত্রী পরিবহনের নিয়ম থাকলেও তা কার্যকর হয় না।আর ‘প্রাইভেট’ লেখা রুপালি রঙের অটোরিকশা ব্যক্তিগত কাজের জন্য রাস্তায় নামানো হলেও সেগুলো বাণিজ্যিকভাবে দেদার যাত্রী পরিবহন করছে। ব্যক্তিগত পরিবহন হিসেবে নিবন্ধন বলে এগুলোতে কোনো মিটারও থাকে না। ট্রাফিক আইন অমান্য করে সড়কে সব সময় চলাচল করছে। এগুলোর বিরুদ্ধে ট্রাফিক পুলিশকে ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না।

২০১৮ সালে ঢাকা সড়ক পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) সিদ্ধান্ত নেয়, প্রাইভেট নিবন্ধিত অটোরিকশা ভাড়ায় চলাচল করতে পারবে না এবং ভাড়ায় চললে তা আটক করতে হবে। কিন্তু সিদ্ধান্তটি মাঠপর্যায়ে কার্যকর হয়নি।

মিটারে না চলার কারণ হিসেবে চালকরা সড়কে যানজট আর মালিকের বেশি জমা ও অন্যান্য খরচের কথা বলেন। তাদের ভাষ্য, অটোরিকশার ভাড়া মিটারে নিতে গেলে তাদের লোকসান হয়। অটোরিকশার মালিকরা বেশি জমা নিয়ে থাকেন। যানজটের কারণে সড়কে দীর্ঘ সময় আটকে থাকতে হয়। তাই বাধ্য হয়ে মিটার ছাড়া চালাতে হয়।

এখন সিএনজিতে যাত্রী কম বলেও জানান চালকরা। যারা রাইড বা উবার-পাঠাও পান না, বিশেষ করে যারা পরিবারের নারী ও বয়স্ক সদস্য নিয়ে রাস্তায় বের হন, তারাই সিএনজি খোঁজেন।সাড়ে পাঁচ বছর ধরে ঢাকায় সিএনজি অটোরিকশা চালাচ্ছেন নান্নু মিয়া।  তিনি বলেন, `আমাদের গাড়িতে এখন মানুষ যেতে চায় না। ফলে আমাদের আয় কমে গেছে। কিন্তু আয়ের চেয়ে ব্যয় বেড়েছে। প্রতিদিন জমা দিতে হয় এক হাজার টাকার বেশি।’

এ ছাড়া গ্যারেজ ভাড়া, মেরামত খরচ, রাজধানীর বিভিন্ন স্ট্যান্ডে চাঁদা ইত্যাদি খরচের কথা উল্লেখ করে চালক রুহান বলেন, `এসব দিয়ে সংসার চালানো কঠিন। মিটারে চালালে অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যাবে।’

যাত্রীদেরও তো সীমিত আয়। শ্যামলীর বাসিন্দা মো. সাগর শাহ্ বেসরকারি চাকরিজীবী। তার কর্মস্থল ফার্মগেট এলাকায়। তিনি বলেন, ‘আমি সাধারণত বাসে যাতায়াত করে থাকি। তবে আজকে দেরি হওয়াতে সিএনজিতে এসেছি। মাত্র দুই কিলোমিটার দূরত্ব হবে। একজন সিএনজিচালক ভাড়া চাইলেন ৩০০ টাকা। শেষে ২০০ টাকায় গন্তব্যে পৌঁছাতে পারলাম।’

মিটারে না চালালেও ন্যায্য ভাড়া নেন বলে দাবি শুভ আহমেদ নামে আরেক চালকের। তিনি বলেন, ‘আমাদের কিছু করার নেই। আমি সকাল ৯টায় বের হই, রাত ১০টার দিকে সিএনজি চালানো বন্ধ করি। প্রতিদিন কম-বেশি দুই হাজার টাকা রুজি হয়। এর মধ্যে জমা এক হাজার টাকা। বাকি টাকায় সংসারের খরচ, বাসা ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, পানির বিল, গ্যাস বিল দিয়ে মাস শেষ করা কঠিন হয়ে পড়ে।’

যাত্রী নিতাই সরকার বলেন, ‘সিএনজি চালকদের মধ্যে একরকম স্বেচ্ছাচার চলছে। আইন-কানুনের কোনো তোয়াক্কা নেই তাদের। সরকার থেকে যে ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে তার এক বিন্দুও কার্যকর হচ্ছে না।’ নিতাই সরকার বলেন, ‘আমি গুলশান-১ থেকে কারওয়ান বাজার যাব। সিএনজিতে উঠে মিটারে যাব বলতেই চালক না করে দিলেন। বলেন মিটার নষ্ট, তাই মিটারে যাবেন না। ৩৫০ টাকার এক পয়সাও কম নেবে না। অনেক দর-কষাকষি করে ৩০০ টাকায় আসতে হলো কারওয়ান বাজার।’

সিএনজি অটোরিকশার এই বিশৃঙ্খলার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সরকার চাইলেই সিএনজিচালিত অটোরিকশায় শৃঙ্খলা নিয়ে আসতে পারে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব বলেন, `শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য আইন প্রয়োগের কোনো প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে না। সর্বশেষ ২০১৮ সালে যে আইনটা করা হয়েছে, তাতে মিটারবিহীন অটোরিকশাকে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকার জরিমানার কথা বলা হয়েছে। এসব আইন ঠিকঠাক প্রয়োগ হচ্ছে না।’

শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অবৈধ সিএনজি অটোরিকশা বড় বাধা বলে মনে করেন মোজাম্মেল হক চৌধুরী। বলেন, ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরে নিবন্ধিত ১৩ হাজার করে ২৬ হাজার সিএনজি অটোরিকশা চলাচল করে। কিন্তু আমাদের পরিসংখ্যানে রাজধানীতে প্রায় ৪০ হাজার অটোরিকশা চলছে। বাড়তি অটোরিকশাগুলো অবৈধভাবে চলছে।’

মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘দেশে নিবন্ধিত প্রায় চার লাখ এবং নিবন্ধনহীন ছয় লাখ সিএনজি অটোরিকশা রয়েছে। আমরা অবৈধ অটোরিকশা নিয়ে বিভিন্ন সময় সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছি। ট্রাফিক বিভাগ যদি সক্রিয় হয়, আইন ঠিকভাবে প্রয়োগ করে তাহলে চালকরা আইন মানতে বাধ্য।’

`প্রাইভেট’ লেখা রুপালি রঙের সিএনজিচালিত অটোরিকশাগুলো বড় সিন্ডিকেটে চলে বলে জানান যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব। এসব অটোরিকশা একদম বন্ধ করে দিলে ভালো হবে বলে মনে করেন তিনি।সিএনজি অটোরিকশার এই নৈরাজ্যের পরও এখন অভিযোগ কম আসে বলে জানান ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আব্দুল জব্বার মন্ডল। তিনি বলেন, ‘কোনো অভিযোগ এলে আমরা তা নিষ্পত্তি করি।’ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের রোড সেফটি উইংয়ের পরিচালক শেখ মোহাম্মদ মাহবুব ই রব্বানীর দাবি, তারা প্রতিদিনই মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অভিযান চালান।

শেখ মোহাম্মদ মাহবুব বলেন, ‘চালকের মিটারে না যাওয়া কিংবা যাত্রীকে চুক্তিতে যেতে বাধ্য করার অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট অটোরিকশাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসি। আর সিএনজি অটোরিকশার বিষয়ে ট্রাফিক পুলিশের বিশেষ দায়িত্ব পালন করার কথা। তাদেরই অবৈধ সিএনজি অটোরিকশা আটক এবং মিটারবিহীন অটোরিকশার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা।’

এবার আসি সিএনজি অটোরিকশার বিষয়ে ট্রাফিক পুলিশের বিশেষ দায়িত্ব পালন করার কথা। তাদেরই অবৈধ সিএনজি অটোরিকশা আটক এবং মিটারবিহীন অটোরিকশার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. সাহেদ আল মাসুদ বলেন, `সিএনজিচালিত অটোরিকশার যেগুলো উবারে চলে, সেগুলোতে মিটার ব্যবহার করা হয় না। উবার না হয় মিটার, যে কোনো একটা ব্যবস্থা পালন করতে হবে।’ কেউ অভিযোগ করলে তারা ব্যবস্থা নেন বলে জানান তিনি।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020  E-Kantha24
Technical Helped by Titans It Solution