বুধবার, ১৭ অগাস্ট ২০২২, ০৫:১১ পূর্বাহ্ন

বিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম বৃদ্ধির আলোচনা

স্টাফ রিপোর্টার,ই-কণ্ঠ টোয়েন্টিফোর ডটকম॥ জ্বালানি তেলের দাম ফের বাড়ানোর আলোচনা চলছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বিষয়টি স্বীকার করে বলেছেন, এ আলোচনা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। দেশে নিত্যপণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। করোনা মহামারির মন্দা অর্থনীতির মধ্যে আবারো জ্বালানির দাম বাড়লে সবকিছুতেই এর প্রভাব পড়বে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও নাভিশ্বাস হয়ে উঠবে। ইতিমধ্যে গ্যাসের দাম বেড়েছে। বিদ্যুতের দামও বাড়ানোর ঘোষণা আসতে পারে চলতি মাসে।

সূত্রমতে, ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠন ও বিশেষজ্ঞদের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও জ্বালানি তেলের দাম লিটার প্রতি ১০ থেকে ৩০ টাকা বাড়াতে পারে সরকার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যদি অর্থ মন্ত্রণালয় ভর্তুকি দেয় তাহলে নাও বাড়তে পারে জ্বালানি তেলের দাম। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বলছে, প্রতিদিন জ্বালানি তেলে তাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।

তারাও পেরে উঠতে পারছে না। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মানুষ যখন তীব্র মূল্যস্ফীতির সঙ্গে টিকে থাকার সংগ্রাম করছে, তখন জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে আবারো বাড়বে পরিবহন ব্যয়। পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারণে বাজারে নিত্যপণ্যের দামও বাড়বে। কৃষি, শিল্প উৎপাদনসহ তেলের মূল্য বৃদ্ধি হলে অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলবে।

করোনা মহামারির ধকল কাটিয়ে অর্থনীতি যখন ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে এমন সময় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারবে না ভোক্তারা। অর্থনীতিবিদরাও মনে করেন বর্তমান পরিস্থিতিতে তেলের মূল্যবৃদ্ধি হবে অযৌক্তিক। করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি যেমন থমকে গিয়েছিল, একইভাবে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের আয়ের ওপরও এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। বহু মানুষ কাজ হারিয়েছেন, অনেকের ব্যবসাও বন্ধ হয়েছে। ফলে আয় কমে এসেছে দেশের একটি বড় অংশের মানুষের। জ্বালানি তেলের দাম আবারো বাড়ানো হলে সর্বত্র বিপর্যয় নেমে আসবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এদিকে জ্বালানি বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা গত সোমবার পরিবহন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের অস্থিতিশীলতার কারণে জুনে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) প্রতিদিন গড়ে ১০০ কোটি ১৮ লাখ টাকা করে লোকসান গুণছে। বিদ্যুৎ ভবনের বৈঠকে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো ছাড়া তাদের কাছে আর কোনো বিকল্প নেই। জ্বালানি তেলের দাম ১০, ২০ অথবা ৩০ টাকা বাড়ানো হলে পরিবহন খরচ কতো বাড়তে পারে, বৈঠকে এ সংশ্লিষ্ট একটি বর্ণনা উপস্থাপন করা হয়। গত নভেম্বরে ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে ১৫ টাকা বাড়ানোর ফলে সরকার কতো টাকা দাম বৃদ্ধি করেছিল, তার ওপর ভিত্তি করে এই প্রাক্কলন করা হয়েছে। ওই উপস্থাপন বলছে, যদি ডিজেলের দাম লিটার প্রতি ১০ টাকা বাড়ানো হয়, তাহলে ঢাকা ও চট্টগ্রামে স্বল্প দূরত্বের বাস ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ১৫ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ২৩ পয়সা হবে।

দূরপাল্লার বাসের ক্ষেত্রে ১ টাকা ৮০ পয়সা থেকে বেড়ে ১ টাকা ৮৯ পয়সা হবে। একইভাবে, ডিজেলের দাম ২০ ও ৩০ টাকা বাড়ানো হলে পরিবহন খরচ প্রতি কিলোমিটারে যথাক্রমে ১৬ পয়সা ও ২৪ পয়সা করে বাড়বে। তবে, ভোক্তা অধিকার সংগঠনের মতে, পরিবহন সংস্থাগুলো কখনোই সরকারের নির্ধারিত ভাড়া মানে না, ফলে যাত্রীদের অতিরিক্ত ভাড়া দিয়েই যাতায়াত করতে হয়। জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের সভাপতিত্বে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পেট্রোবাংলা, বিপিসি, বিআরটিএ, বিআইডব্লিউটিএ, পরিবহন ব্যবসায়ী সমিতির নেতা ও ফিলিং স্টেশন মালিকরা। বৈঠকে অংশ নেয়া একাধিক ব্যক্তি প্রতিমন্ত্রীর বরাত দিয়ে জানান, জ্বালানি তেলের নতুন মূল্য ঘোষণার আগে সরকার পরিবহন ভাড়া নির্ধারণ করতে চায়। তবে মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, পরিবহন মালিকদের সঙ্গে এটি ছিল প্রাথমিক বৈঠক। তাদের সঙ্গে আরও বৈঠক হবে। কারণ তেলের দাম বাড়ালে পরিবহনগুলো অনেক বেশি ভাড়া আদায় করে। এতে দেশে নৈরাজ তৈরি হবে। এজন্যই পরিবহন মালিকদের সঙ্গে আরও বৈঠক হবে। বিপিসি’র হিসাবে, চলতি মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে ১৫৯ লিটার ধারণ ক্ষমতার ডিজেলের ব্যারেলের গড় মূল্য ছিল ১৭১ ডলার। এ ছাড়াও, ১ ব্যারেল অকটেন ও অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল যথাক্রমে ১৪৮ ও ১১৫ ডলার।

বিপিসির দাবি, প্রতি লিটার অকটেন ৮৯ টাকা ও ডিজেল ৮০ টাকায় বিক্রি হওয়ায় লোকসান হচ্ছে যথাক্রমে ৩৬ টাকা ও ৫৫ টাকা ১৫ পয়সা। বিপিসি এখন অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে ১ লিটার পেট্রোল পেতে ৯৬ টাকা ৮৭ পয়সা খরচ করলেও তা ৮৬ টাকায় বিক্রি করে। বিপিসি বছরে ৬২ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করে, যারমধ্যে ৭২ শতাংশ ডিজেল, ৪ দশমিক ৮ শতাংশ অকটেন ও ৬ শতাংশ অপরিশোধিত তেল। এর আগে গত ১৪ জুন জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। তিনি জানিয়েছেন, মূল্য সমন্বয় নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। তবে এখনো কিছু নির্ধারিত হয়নি। নসরুল হামিদ বলেন, যেভাবে বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দাম বাড়ছে সেটা খুব অস্বাভাবিক। আমাদের চিন্তা করতে হবে এই অবস্থা কতদিন চলবে। বিপিসি প্রতিদিন শতকোটি টাকা লোকসান গুনছে। দাম পরিবর্তন করবো কি-না, কোথায় সমন্বয় করবো বা আদৌ করবো কি-না এসব বিষয় নিয়ে চিন্তা করছি। এরপর সরকারের কাছে প্রস্তাব করবো।

তিনি বলেন, লোকসানের দায় কে নেবে? আমাদের গ্রাহকরা আছেন, যারা জ্বালানি পরিবহন করেন তাদের ওপর কোনো চাপ পড়ুক তাও আমরা চাই না। আমরা চাই সমন্বয় করতে। সেটা নিয়ে আমরা কাজ করছি। বিপিসি প্রতিদিন শতকোটি টাকা লোকসান গুনছে। আমরা আসলে কতো এই লোকসান করবো? প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলো প্রাইস অ্যাডজাস্টমেন্ট করে। বাড়লে বাড়ায়, কমলে কমায়। আমরা এই মুহূর্তে সেদিকে যাবো কিনা, সেটা চিন্তার বিষয়। এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ফলে ভারতের সঙ্গে এখন আমাদের তেলের দামের অর্ধেক পার্থক্য তৈরি হয়ে গেছে। সে তুলনায় এখনো আমরা স্থিতিশীল অবস্থায় আছি। আমরা কতোটা বাড়াবো, সে জায়গাটা নিয়ে আমাদের ভাবতে হচ্ছে। যাত্রীদের ওপর কী ইফেক্ট হবে, পরিবহনে কী ইফেক্ট- পড়বে সব আমাদের ভাবতে হচ্ছে। এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজ্যুমার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, বিপিসি বা জ্বালানি বিভাগের তেলের দাম নির্ধারণের কোনো এখতিয়ার নেই। কারণ বিপিসি নিজেই এখানে ব্যবসা করে। তাদের হিসাব-নিকাশেও অনেক ধরনের চুরি ও গোঁজামিল রয়েছে। ডিজেল ও কেরোসিনসহ জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে প্রশাসনিক প্রতিকার না পেলে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হবে কনজুমার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। গত ২০ জুন ক্যাব-এর উদ্যোগে ‘জ্বালানি তেলের মূল্য আবারো অবৈধ উপায়ে বৃদ্ধি না করার দাবি’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে ক্যাবের জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, জ্বালানি বিভাগ এবং বিপিসি অবৈধভাবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ালে ক্যাব মানবে না।

জ্বালানির দাম বাড়ানো হলে ক্যাব কি করবে? তিনি বলেন, আমরা নাগরিক সমাজ। আমরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আন্দোলন করতে পারি না। আমরা বুদ্ধিভিত্তিক আলোচনা এবং আলোড়ন তৈরি করার চেষ্টা করি। জ্বালানির ক্ষেত্রেও প্রথমে আমরা প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে অবহিত করবো। যদি তাতে কাজ না হয় তাহলে আমাদের উচ্চ আদালতে যাবার সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, বিপিসি, বিইআরসি, পেট্রোবাংলাসহ এসব কোম্পানির পরিচালনায় আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতা থাকায় জ্বালানি খাতে নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে। তাদের কাছ থেকে এসব কোম্পানি মুক্ত করা আমাদের এখন মৌলিক দায়িত্ব। এসব কোম্পানি মুক্ত করা ছাড়া কোনোভাবেই এই খাতে ভোক্তাদের জ্বালানি অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হবে না। জ্বালানি বিভাগ এবং বিপিসি অবৈধভাবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়াচ্ছে এটাকে মানছি না। আমরা বৈধ প্রক্রিয়ায় জ্বালানির দাম বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। কারণ বৈধভাবে বাড়ালে তাদের প্রস্তাবটি বিইআরসির কাছে আনতে হবে এবং বিইআরসিতে আনলে আমরা ভোক্তারা গণশুনানির মাধ্যমে বিপিসির প্রস্তাবে কোনটি যৌক্তিক-অযৌক্তিক, সেটা পূঙ্খানুপুঙ্খকভাবে মতামত দিতে পারবো। কিন্তু তারা বিইআরসিতে না এসে একতরফাভাবে তাদের ১০০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে, এই যুক্তিতে দাম বাড়াতে যাচ্ছে।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020  E-Kantha24
Technical Helped by Titans It Solution