সোমবার, ০৮ অগাস্ট ২০২২, ০৪:৫৬ পূর্বাহ্ন

ছয় মাসে তিন সাংবাদিক খুন, নির্যাতিত ৫৩

স্টাফ রিপোর্টার, ই-কণ্ঠ টোয়েন্টিফোর ডটকম॥ দেশে চলতি বছর প্রথম ছয় মাসে তিনজন সাংবাদিক খুন হয়েছেন। এ ছাড়া রহস্যজনকভাবে ঢাকায় নিহত হয়েছেন আরো দুজন। এর বাইরে বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অন্তত ৫৩ জন।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য পাওয়া গেছে।

এই হিসাবের বাইরে সর্বশেষ গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর তালতলা এলাকায় ভিক্টর ট্রেডিং করপোরেশনে মেডিক্যালের যন্ত্রাংশ কেনাকাটার বিষয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলার শিকার হন বেসরকারি টেলিভিশন ডিবিসি নিউজের স্টাফ রিপোর্টার সাইফুল ইসলাম জুয়েল ও ভিডিওগ্রাফার আজাদ আহমেদ। আগের দিন সোমবার ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় স্থানীয় সাংবাদিক মুজাহিদুল ইসলাম নাঈমকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। স্থানীয় পৌর মেয়রের ভাই ও তাঁর অনুসারীরা এই হামলা চালান বলে অভিযোগ উঠেছে।

এদিকে সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি এ বছর প্রথম ছয় মাসের সাংবাদিক নির্যাতনের তথ্য বিশ্লেষণ করে আসকের প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানীতে ১২ ঘটনায় ২৫ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া বরিশালে চারটি ঘটনায় ২৩ জন এবং নারায়ণগঞ্জে পাঁচটি ঘটনায় আরো পাঁচজন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

সাংবাদিক নির্যাতনের বিষয়ে জানতে চাইলে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ উপপরিচালক নীনা গোস্বামী বলেন, তাঁরা বিভিন্ন গণমাধ্যম ও নিজস্ব অনুসন্ধান থেকে সাংবাদিক নির্যাতনের এই চিত্র পেয়েছেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে সাংবাদিকদের নির্যাতন করা হয়। মত প্রকাশের কারণে এবং সমাজের বিভিন্ন অনিয়ম তুলে ধরার কারণে তাঁরা নির্যাতনের শিকার হন।

দেশে এ বছর খুন হওয়া তিন সাংবাদিকের মধ্যে সর্বশেষ কুষ্টিয়ার স্থানীয় সাংবাদিক হাসিবুর রহমান রুবেলকে নিজ কর্মস্থল থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়। গত ৩ জুলাই মোবাইল ফোনে কল পেয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে এনএস রোডের সিঙ্গার মোড়ের দিকে যান তিনি। এর পর থেকে তাঁর ব্যবহৃত তিনটি মোবাইল ফোন নম্বরই বন্ধ পাওয়া যায়। চার দিন পর ৭ জুলাই কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায় গড়াই নদীর ওপর নির্মাণাধীন কুমারখালী যদুবয়রা সংযোগ সেতুর নিচ থেকে রুবেলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরদিন রুবেলের চাচা মিজানুর রহমান বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন।

এরপর গত ১৬ জুলাই রুবেল হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে কুষ্টিয়া শহরের থানাপাড়া এলাকার কাজী সোহান শরিফ (৪০) ও খন্দকার আশিকুর রহমান জুয়েলকে (৩৫) গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-১২। তাঁদের গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়ে র‌্যাবের কুষ্টিয়া ক্যাম্পের কম্পানি কমান্ডার ইলিয়াস খান বলেন, গ্রেপ্তারকৃতরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। রুবেলের সঙ্গে স্থানীয় একটি ঠিকাদারি চক্রের বিরোধ চলছিল। আর সেই বিরোধের জের ধরেই রুবেলকে খুন করা হয় বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।

এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে প্রাথমিকভাবে র‌্যাবের তদন্তে উঠে এসেছে, স্থানীয় একটি অপরাধীচক্র দীর্ঘদিন ধরে কুষ্টিয়ার অপরাধজগৎ নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের বিরুদ্ধে সাংবাদিকরা কলম ধরলেই তাঁদের হত্যার হুমকিধমকির পাশাপাশি পেশাগত কাজে বাধা দেওয়া হয়।

এর আগে গত ৫ জুন পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় খুন হন আবু জাফর প্রদীপ। স্থানীয় একটি পুকুর থেকে তাঁর ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। আবু জাফর দৈনিক গণকণ্ঠ পত্রিকার কলাপাড়া প্রতিনিধি ছিলেন। এ ছাড়া কলাপাড়া সাংবাদিক ক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পুলিশ জানায়, স্থানীয় একটি অপরাধীচক্রের হাতে খুনের শিকার হন তিনি।

গত ১৩ এপ্রিল পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলায় গুলিতে খুন হন সাংবাদিক মহিউদ্দিন সরকার নাঈম। তিনি কুমিল্লা থেকে প্রকাশিত কুমিল্লার ডাক পত্রিকায় স্টাফ রিপোর্টার ছিলেন। এই হত্যার ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করার কথা জানিয়ে কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সোহান সরকার বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা মাদক কারবারি চক্রের সদস্য। তাদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করতে গিয়ে খুন হন সাংবাদিক মহিউদ্দিন। কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার অলুয়া গ্রামের বাসিন্দা সাংবাদিক মহিউদ্দিন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিহত মহিউদ্দিন হত্যা মামলার প্রধান আসামি রাজুর বিরুদ্ধে অস্ত্র মাদকসহ আট থেকে ১০টি মামলা রয়েছে বিভিন্ন থানায়। পরে অবশ্য বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় রাজু।

এ ছাড়া গত ৮ জুন রাজধানীর হাতিরঝিল থেকে বেসরকারি টেলিভিশন ডিবিসি নিউজের আবদুল বারীর ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। আর গত ১৪ জুলাই রাজধানীর হাজারীবাগের রায়েরবাজার এলাকায় মদিনা মসজিদের পাশে ২৯৯/৫ নম্বর বাড়ির দ্বিতীয় তলার ফ্ল্যাট থেকে সাংবাদিক সোহানা পারভীন তুলির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

সাংবাদিক খুন ও নির্যাতন বিষয়ে জানতে চাইলে মানবাধিকারকর্মী নুর খান লিটন বলেন, ‘সমাজের নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে সংবাদ করতে অপরাধীদের টার্গেটে পরিণত হন সাংবাদিকরা। এরপর ওই স্বার্থবাদী গোষ্ঠী সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালায়। সাংবাদিকদের সুরক্ষা দেওয়ার দায় রাষ্ট্রকে নিতে হবে। কারণ সাংবাদিকরা সব সময় দেশ ও জনগণের পক্ষে কথা বলেন।

এদিকে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংগঠন আর্টিকল নাইনটিনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত দেশে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১১৮ সাংবাদিক। সংস্থাটি এক বিবৃতিতে সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

আর্টিকল নাইনটিন বলেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সারা দেশে সাংবাদিকদের ওপর ৬২টি শারীরিক হামলা হয়েছে। এ সময়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ২৩ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ১০টি মামলায় তিনজন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলাকারী যে বা যারাই হোক তাদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

সাংবাদিকদের নির্যাতনের ঘটনায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং অপরাধ ও সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মূলধারার সাংবাদিকতা করতে গিয়ে যেসব হত্যা বা নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে, সেগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত করে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা জরুরি। সারা দেশেই নামসর্বস্ব অনলাইন বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক ইউটিউব চ্যানেলের ভিজিটিং কার্ডধারী সাংবাদিকদের ঠেকাতে হবে। কারণ তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শুধু ব্যক্তিস্বার্থে এক শ্রেণির মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে স্বার্থ হাসিল করছে। এতে মূলধারার গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের পেশাদারির ক্ষতি করছে। সরকারের উচিত মূলধারার গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের সহায়তা নিয়ে নামসর্বস্ব সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020  E-Kantha24
Technical Helped by Titans It Solution