শনিবার, ২৮ মে ২০২২, ১০:৩৩ অপরাহ্ন

চির চেনা রূপে ফিরেছে রাজধানী

স্টাফ রিপোর্টার॥ ঈদ ও ঈদের রেশ দুটোই কেটে গেছে। কী যে হাসি আনন্দে মেতেছিল রাজধানীবাসী! সবই বলা চলে স্মৃতি এখন। নিকটবর্তী স্মৃতি মনে দোলা দিচ্ছে। তা যতই দিক, বাস্তবতা অনেক কঠিন। তাই সাময়িক ছুটি শেষে ফিরতে হয়েছে জীবন সংগ্রামে। জীবিকার টান। এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন। উপেক্ষা করবে, সাধ্য কার? ফলে ঈদের পর চেনা চেহারায় ফিরেছে রাজধানী ঢাকা। শহরজুড়ে ব্যস্ত ছোটাছুটি। কর্মচাঞ্চল্য। নতুন এই শুরু দেখে মনেই হয় না, কদিন আগে সব ভুলে কেবলই ঈদ আনন্দে মেতেছিল মানুষ।

গত ৩ মে উদ্যাপিত হয় মুসলমানদের সবচেয়ে বড় উৎসব ঈদ-উল ফিতর। তার আগে থেকে বাড়ি ফিরতে শুরু করে কর্মজীবী মানুষ। দেখতে দেখতে খালি হয়ে যায় ঢাকা। প্রতিবারের মতো এবারও উৎসব উদ্যাপন করতে লাখ লাখ মানুষ রাজধানী ছেড়ে যান। ফাঁকা হয়ে যায় মেগাসিটি। ঈদের সরকারী ছুটি ছিল তিন দিনের। এ ছুটি টেনেটুনে চুইংগামের মতো লম্বা করা হয়। গত ৪ মে সরকারী ছুটি শেষ হলেও, পরদিন বৃহস্পতিবার হওয়ায় উপস্থিতি ছিল সামান্য। অনেকেই যোগ দেননি কাজে। আর শুক্র এবং শনিবার ছিল সাপ্তাহিক ছুটি। এমন সুযোগ কেউ হাতছাড়া করে? সঙ্গত কারণেই ঈদের রেশ ছিল রাজধানীজুড়ে। রবিবার থেকে পুরোদমে চালু হতে থাকে অফিস আদালত শিক্ষা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এর পর থেকে ক্রমে ব্যস্ততা বেড়েছে।

তারও আগে ঢাকায় ফিরেছে অধিকাংশ কর্মজীবী মানুষ। অনেকদিন তালাবদ্ধ থাকা ঘরের দ্বার খুলেছে একে একে। অন্ধকার বাড়িগুলোতে আলো জ্বলছে এখন। এমনকি বারান্দার গাছগুলো পর্যাপ্ত জল পেয়ে আগের মতোই সজীব সতেজ হয়ে উঠছে। চারপাশের বাসাবাড়ি, অলিগলির দিকে তাকিয়ে বোঝা যাচ্ছে, সবই আগের নিয়মে ফিরছে।

সরকারী, বেসরকারী, আধা সরকারী, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের অফিস এখন খোলা। রমজানে অফিস সময়সূচীতে পরিবর্তন এসেছিল। সকাল ৯টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত থাকতে হতো অফিসে। বর্তমানে আগের নিয়মে সকাল ৯টা থেকে ৫টা। এ নিয়মেই চলছে কাজকর্ম। প্রথম কয়েকদিন ঢিলেঢালা ভাব থাকলেও, একটু একটু করে গতি এসেছে কাজকর্মে। এখন পুরনো নিয়মে অফিস। সকাল ৯টায় শুরু হয়ে চলছে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে নিয়মিত অফিস করছেন মন্ত্রী সচিব থেকে শুরু করে সাধারণ কর্মকর্তা কর্মচারীরা। রেলওয়ের টিটিই বরখাস্ত ইস্যু, সয়াবিনের সঙ্কটসহ আরও কিছু গরমাগরম ইস্যু চলমান থাকায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোতে বাড়তি ব্যস্ততা লক্ষ্য করা গেছে। বাকিগুলোতে চলছে রুটিন কাজ।

একইভাবে কাজে ফিরেছেন খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। ঢাকার গার্মেন্টসপ্রধান এলাকাগুলো ঈদের কয়েকদিন অদ্ভুত নির্জন হয়ে পড়েছিল। এখন কর্মচঞ্চল। সময়মতো নারীরা কাজে যাচ্ছেন। ফিরছেনও। তাদের দলবেঁধে আসা যাওয়া দেখে বোঝা যায়, প্রতিদিনের সংগ্রামমুখর জীবনে ফিরেছেন তারা। মিরপুরের একটি গার্মেন্টসে কাজ করেন শরীফা। তার মতে, ঈদ হচ্ছে ‘রেস্ট’ নেয়া। গ্রামে গিয়ে একটু আরাম করে ঘুমানো। কিন্তু গরিব মানুষের কাজ না করলে ভাত জুটে না। তাই কর্মস্থল থেকে দূরে গেলে অজানা আতঙ্কও কাজ করে মনে। অবশেষে কাজে ফিরতে পেরে নির্ভার বলে জানান তিনি। রিক্সাচালক ভ্যানচালক সবজি বিক্রেতাসহ শ্রমজীবী মানুষেরা গ্রামে গিয়েছিলেন পরিবার পরিজনের সঙ্গে ঈদ করতে। জীবিকার প্রয়োজনে আবারও রাজধানীতে ফিরেছেন তারা। বড় অংশটি ফিরেছে। কারও কাজ আগে থেকেই নির্ধারিত। কেউ নতুন করে কাজের সন্ধান করছেন। ফার্মগেট এলাকার রিক্সাচালক খোরশেদ গ্রামে ঈদ করতে পেরে খুশি। তবে এখন দীর্ঘ সময় রিক্সা চালাচ্ছেন। কারণ জানতে চাইলে বললেন, ‘ঈদের চাইর দিন রিক্সা চালাই নাই। টেকা তো শেষ। তাই দেনা কইরা ঢাকায় আইছি। এহন কামাই কইরা শোধ করা লাগব। আর রইদটাও এখন কম। তাই বেশি সময় চালাইতে পারতাছি।’

অবশ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অন্যরকম প্রাণচাঞ্চল্য। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি প্রায় শতভাগ বলে জানা গেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে দিয়ে আসা যাওয়ার সময় ইউনিফর্ম পরা শিক্ষার্থীদের বড় সমাবেশ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে রিইউনিয়ন হচ্ছে। তেজগাঁও কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী সায়মা বলছিল, ঈদের ছুটিতে বাড়ি গিয়েছিলাম আমরা। বেশ ভাল কেটেছে সেখানে। এখন কলেজে এসে বন্ধুদের সবার সঙ্গে দেখা হলো, এটাও আনন্দের। আমরা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরেছি। ঈদের পরও ‘ঈদ মোবারক’ বলেছি। প্রথম দিন থেকে শিক্ষকরাও পুরোদমে ক্লাসে ফিরেছেন বলে জানায় সে। ঢাকার মার্কেট শপিংমলে কিছুদিন আগের সেই ভিড় নেই। ঈদে ব্যাপক কেনাকাটা হয়েছে। এখন তাই ক্রেতা শূন্য অবস্থা। তবুও শোরুম খোলা রেখে ব্যবসা জমানোর চেষ্টা করছেন ব্যবসায়ীরা।

জরুরী কাজকর্মের পাশাপাশি রাজধানীতে সাংস্কৃতিক কর্মকা-ও শুরু হয়ে গেছে। গত ২৫ বৈশাখ ছিল রবীন্দ্রজয়ন্তী। এ উপলক্ষে সরকারীভাবে বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করা হয়। দুই দিনের রবীন্দ্র উৎসব আয়োজন করে ছায়ানট। শিল্পকলা একাডেমিতেও রবীন্দ্রনাথের জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন করা হয়। এখনও চলছে প্রদর্শনী। মঞ্চ নাটকের প্রদর্শনীও শুরু হয়েছে।

তবে শহর যে স্বাভাবিক চেহারায় ফিরছে তা সবচেয়ে বেশি বোঝা যায় রাস্তায় নামলে। ঢাকার প্রধান প্রধান সড়কে পুনরায় চাপ বেড়েছে যানবাহনের। যে সড়কগুলো ঈদের ছুটিতে ফাঁকা ছিল সেগুলোতে এখন সব ধরনের যানবাহন চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে। একই কারণে ছোট ও মাঝারি আকারের যানজটও লেগে যাচ্ছে কোন কোন এলাকায়। গত দুদিন বৃষ্টি হওয়ায় দুর্ভোগের পাশাপাশি দেখা গেছে মাঝারি আকারের যানজট। এ অবস্থার মধ্যেও কাজ কর্ম চালিয়ে যেতে দেখা গেছে নগরবাসীকে। সামনের দিনগুলোতে ব্যস্ততা আরও বাড়বে। পুরনো চেহারায় ফিরবে রাজধানী ঢাকা।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020  E-Kantha24
Technical Helped by Titans It Solution