শুক্রবার, ০৭ মে ২০২১, ১০:১০ অপরাহ্ন

চিকিৎসক হেনস্তাকারী পুলিশদের বিরুদ্ধে শাস্তি চায় এফডিএসআর

স্টাফ রিপোর্টারঃকরোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) সংক্রমণকালে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন দেশের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। সংক্রমণরোধে সরকার ঘোষিত বিধিনিষেধ চলাকালীন সময়ে চিকিৎসক হেনস্তাকারী পুলিশদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে চিকিৎসকদের সংগঠন এফডিএসআর (ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি, রাইটস এন্ড রেসপন্সিবিলিজ)।

একইসঙ্গে নানারকমের অভিযোগে গ্রেফতারকৃত পাপিয়ার সঙ্গে একজন নারী চিকিৎসককে তুলনা করা ‘চরম অবমাননাকর’ বলে এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে সংগঠনটি।

সোমবার (১৯ এপ্রিল) করোনায় চলমান বিধিনিষেধে চিকিৎসকদের হয়রানির প্রতিবাদে আয়োজিত অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে এই প্রতিবাদ জানায় সংগঠনটি। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে লিখিত প্রতিবাদলিপি পাঠ করেন সংগঠনটির চেয়ারম্যান ডা. আবুল হাসনাৎ মিল্টন।

তিনি বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে সারা পৃথিবীতে যেখানে ডাক্তারদের বিশেষভাবে সম্মানিত করা হচ্ছে, সেখানে শুরু থেকে আমরা পদে পদে বাধাগ্রস্ত হয়েছি। শুরুতে নকল মাস্ক সরবরাহ করে আমাদের মৃত্যুর সামনে দাঁড় করানো হয়। একসময় কর্তব্যরত চিকিৎসকদের জন্য আবাসন ও যানবাহনের ব্যবস্থা করা হলেও তা আকস্মিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

ডা. আবুল হাসনাৎ মিল্টন বলেন, পুলিশ ডা. জেনির কাছে অন্যায়ভাবে মুভমেন্ট পাশ চেয়েছে। অথচ ডাক্তারদের মুভমেন্ট পাশ লাগবে না বলে ইতোমধ্যেই নিশ্চিত করা হয়েছে। আমরা আরও দেখেছি, পতিতাবৃত্তির পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগে গ্রেফতারকৃত পাপিয়ার সঙ্গে পুলিশ ডা. জেনির তুলনা করেছে, যা একজন নারী চিকিৎসকের জন্য চরম অবমাননাকর।

তিনি বলেন, আমরা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করেছি, একদল পুরুষ পুলিশ সদস্য একজন নারী চিকিৎসককে প্রকাশ্যে রাজপথে হেনস্তা করছে। বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে ডাক্তাররা যখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সম্মুখসারিতে লড়ছে, হাসপাতালে অসংখ্য কোভিড রোগীর চিকিৎসা শেষে ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফেরার পথে পুলিশ ডা. সাঈদা শওকত জেনির গাড়ি থামিয়ে তার কাছে পরিচয়পত্র দেখতে চায়। এ সময়ে নিজের পরিচয় ও গাড়িতে থাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের পরিচালক কর্তৃক ইস্যুকৃত মুভমেন্ট পাশ, বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো সম্বলিত স্টিকার ও বিএসএমএমইউর লোগোসহ ডাক্তারের নামাঙ্কিত অ্যাপ্রন দেখালে সবকিছুকে ভুয়া বলে পুলিশ ডা. জেনিকে চরমভাবে উত্যক্ত করে। এর মাধ্যমে পুলিশ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও চিকিৎসক সমাজকেও হেয় করেছে। এই ঘটনার কোনো ভিডিও করা হয়নি। অথচ ডা. জেনিকে হেনস্তা করার মাধ্যমে উত্তেজিত করে ঘটনার আংশিক ভিডিও করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন ডা. মিল্টন।

তিনি বলেন, চিকিৎসকের পাশাপাশি বীর মুক্তিযোদ্ধা শওকত আলী বীর বিক্রমের কন্যার পরিচয় দেওয়ার পরেও পুলিশ যেভাবে ঔদ্ধত্য ভাষায় কথা বলেছে, তা যুগপৎ আমাদের ব্যথিত এবং ক্ষুব্ধ করেছে। আমরা ভাবতেই পারি না, একজন নারী চিকিৎসককে এতগুলো পুরুষ পুলিশ মিলে এমন ঔদ্ধত্যের সঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে? পুলিশের এই অন্যায়ের প্রতিবাদে সাহসের সঙ্গে রুখে দাঁড়ানোর জন্য আমরা ডা. সাঈদা শওকত জেনিকে অভিনন্দন জানাই। পাশাপাশি করোনার এই দুঃসময়ে চিকিৎসক হেনস্তাকারী পুলিশদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।

একই সঙ্গে মহিলাদের সাথে কথা বলবার জন্য রাজপথে পর্যাপ্ত সংখ্যক মহিলা পুলিশ নিয়োগের দাবি জানানো হয় এফডিএসআরের পক্ষ থেকে।

ওই ঘটনা সরকারকে বিপদে ফেলার ষড়যন্ত্র কি না- বিষয়টি তদন্তের দাবি রাখে, জানিয়ে সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার যখন করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তরিকতার সঙ্গে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যখন বারবার চিকিৎসক হয়রানি বন্ধের জন্য আমাদের আশ্বস্ত করছে, তখন মাঠপর্যায়ে চিকিৎসকদের প্রতি কতিপয় ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশের হয়রানিমূলক আচরণে আমরা যুগপৎ হতাশ ও ক্ষুব্ধ। এসব ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ কর্মকর্তার অতীত সম্পর্কে যেসব তথ্য ইতিমধ্যে ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে, তাতে আমরা রীতিমতো আতঙ্কিত বোধ করছি। তবে কি এসব ম্যাজিস্ট্রেট-পুলিশ সুকৌশলে ডাক্তার ও পুলিশ বাহিনীকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে সরকারকেই বিপদে ফেলবার ষড়যন্ত্র করছে? এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দেখা উচিত।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, প্রতিটি চিকিৎসকের যেমন ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক যানবাহনে আসা-যাওয়া করার সুযোগ নাই, আমরা চাই ডাক্তারদের কর্মস্থলে যাতায়াত সম্পূর্ণ নিরাপদ হোক। প্রয়োজনে বিআরটিসির অলস বসে থাকা বাসে ডাক্তারসহ সকল স্বাস্থ্যকর্মীকে যাতায়াতের সুযোগ দেয়া হোক। করোনা ইউনিটে কর্তব্যরত সকল চিকিৎসকের আবাসন, যানবাহন ও বিশেষ ডিউটি রোস্টারের ব্যবস্থা করা হোক। পেশাগত দায়িত্ব পালনের পথে ডাক্তারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক। করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সম্মান ও নিরাপত্তার সঙ্গে কাজ করার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ দেয়া হোক। সংবাদ সম্মেলনে কোভিড-১৯ সংক্রমিত হয়ে মারা যাওয়া চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ বাহিনী ও অন্যান্য পেশার সকলকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।

উল্লেখ্য, সরকারি বিধিনিষেধ চলার পঞ্চম দিনে রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে চলা ভ্রাম্যমান আদালতের ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে আইডি কার্ড প্রদর্শন ও মুভমেন্ট পাস নিয়ে বাকবিতন্ডার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এ দিন ভ্রাম্যমান ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতের চেকে পড়েন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সাঈদা শওকত জেনি সেখানে ঢাকা জেলা প্রশাসন অফিসের সহকারী কমিশনার শেখ মো. মামুনুর রশিদ আদালত পরিচালনা করছিলেন। নিউ মার্কেট থানার একজন পরিদর্শকের নেতৃত্বে একাধিক পুলিশ সদস্য সেখানে দায়িত্বরত ছিলেন। এ ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলে নানা রকম আলোচনা ও সমালোচনা।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020  E-Kantha24
Technical Helped by Titans It Solution