শনিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২১, ০৩:৩০ অপরাহ্ন

চলে গেলেন কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক

রাজশাহী প্রতিনিধিঃ স্বাধীনতা পুরস্কার ও একুশে পদক পাওয়া প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক আর নেই। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন)।

সোমবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাজশাহী শহরের নিজ বাসভবন ‘উজানে’ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। তিনি হার্টে সমস্যা ও ডায়াবেটিস ছাড়াও বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যায় ভুগছিলেন।

তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন হাসান আজিজুল হকের ছেলে এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ইমতিয়াজ হাসান।

হাসান আজিজুল হক মৃত্যুকালে স্ত্রী শামসুন নাহার, তিন কন্যা ও এক পুত্র রেখে গেছেন। মঙ্গলবার বাদ জোহর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে বেলা ১২টা থেকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তার মরদেহে শ্রদ্ধা জানাবেন সর্বস্তরের জনতা।

প্রখ্যাত এই কথাসাহিত্যিক কয়েক মাস ধরেই অসুস্থ ছিলেন। গত বুধবার অধ্যাপক ইমতিয়াজ হাসান জানিয়েছিলেন তার বাবা অসুস্থ। চিকিৎসকের পরামর্শ মতে হাসান আজিজুল হককে স্যালাইন ও ওষুধ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বাসাতেই তার ইসিজি করানো হয়েছে।

গত আগস্ট মাসের শেষ দিকে হাসান আজিজুল হকের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় নেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা শেষে ৯ সেপ্টেম্বর তিনি রাজশাহীতে ফিরে আসেন। এরপর থেকে বাসাতেই তার চিকিৎসা চলছিল।

হাসান আজিজুল হক ১৯৩৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার যবগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি রাজশাহীতে কাটিয়েছেন। ১৯৭৩ সালে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৪ সাল পর্যন্ত একনাগাড়ে ৩১ বছর অধ্যাপনা করেন। এরপর থেকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব পাশে নগরের চৌদ্দপায় এলাকার আবাসিক এলাকায় বসবাস করে আসছেন।

ছোটগল্পের এই রাজপুত্র ১৯৩৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি অবিভক্ত বাংলার বর্ধমানের যবগ্রামে জন্ম নেন তিনি। দীর্ঘ এই সময়ে দেখেছেন অনেক কিছুই। সাক্ষী বহু ঐতিহাসিক ঘটনার। সেগুলো ধরে রেখেছেন কাগজে, পরম মমতায়। গল্পগ্রন্থ ‘সমুদ্রের স্বপ্ন’, ‘শীতের অরণ্য’ কিংবা উপন্যাস ‘আগুনপাখি’ তাকে নিয়ে গেছে অনন্য এক উচ্চতায়।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের পড়াশোনা নিজের গ্রামেই করেছেন হাসান আজিজুল হক। ১৯৫৪ সালে যবগ্রাম মহারাণী কাশীশ্বরী উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৫৬ সালে খুলনার দৌলতপুরের ব্রজলাল কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। যৌবনের শুরুতেই ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন হাসান আজিজুল হক।

রাজনীতি করার কারণে পাকিস্তান সরকারের রোষানলে পড়তে হয় তাকে। কলেজের অধ্যক্ষ তার মেধাবৃত্তি ফাইলচাপা করে রাখেন এবং শেষ পর্যন্ত তাকে কলেজ ছাড়তে বাধ্য করেন। পরে তিনি ভর্তি হন রাজশাহী সরকারি কলেজে। ১৯৫৮ সালে এই কলেজ থেকে দর্শনশাস্ত্রে সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি লাভ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৬০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭৩ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগে অধ্যাপনা করেন।

মূলত ষাটের দশক থেকেই ছোটগল্পকার হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন হাসান আজিজুল হক। তবে ১৯৫৪ সালে স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা দেওয়ার পরই লিখে ফেলেন প্রথম উপন্যাস। ১৯৫৭ সালে লেখেন উপন্যাস শামুক। যা ২০১৫ সালের বইমেলায় প্রকাশিত হয়। এরপর অসংখ্য ছোটগল্প, গ্রন্থ, প্রবন্ধ, নাটক, উপন্যাস, শিশুতোষ সাহিত্য।

কথাসাহিত্যে অনবদ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার, পদক ও সম্মাননা। এর মধ্যে রয়েছে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৭), বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭০), অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮১), আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৩), অগ্রণী ব্যাংক সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৪), ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৮), কাজী মাহবুব উল্লাহ ও বেগম জেবুন্নিসা পুরস্কার। এছাড়া ১৯৯৯ সালে ‘একুশে পদকে’ ভূষিত হন হাসান আজিজুল হক। ‘আগুনপাখি’ উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন আনন্দ পুরস্কার। ২০১২ সালে তিনি ভারতের আসাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডিলিট ডিগ্রি পান।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020  E-Kantha24
Technical Helped by Titans It Solution