সোমবার, ০৮ অগাস্ট ২০২২, ০৫:০২ পূর্বাহ্ন

অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা

স্টাফ রিপোর্টার,ই-কণ্ঠ টোয়েন্টিফোর ডটকম॥ দেশে অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে; কিন্তু প্রতিকারের উদ্যোগ নেই। ফলে রেলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ৮২ শতাংশ রেলক্রসিং অরক্ষিত; অর্থাৎ ট্রেন চলাচলের সময় যানবাহন আটকানোর জন্য এসব ক্রসিংয়ে কোনো পাহারাদার কিংবা প্রতিবন্ধকতা নেই। বাকি ১৮ শতাংশ ক্রসিংয়ে পাহারাদার ও প্রতিবন্ধকতা আছে; কিন্তু পাহারাদারের অবহেলায় কিংবা চালকের অসতর্কতায় সেগুলোতেও ঘটছে দুর্ঘটনা।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ সালে ৩৮ দুর্ঘটনায় ৬৯ জন, ২০২১ সালে ৪৩ দুর্ঘটনায় ৭৬ জন, ২০২২ সালের ২৮ জুলাই পর্যন্ত ৩৫ দুর্ঘটনায় ৭৪ জন মারা যান।

রেলক্রসিংয়ের দুর্ঘটনা ঠেকাতে প্রথমেই দরকার সচেতনতা। এ ছাড়া দুর্ঘটনা রোধ করার উপায় কম। দেখা যাচ্ছে, ট্রেন দেখেও রেলক্রসিংয়ের বার বা প্রতিবন্ধকতা উঠিয়ে দ্রুত পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেন চালক-পথচারীরা। দেশের কোনো ট্রেনই নিঃশব্দে চলে না। ট্রেন আসার শব্দ দূর থেকেই শোনা যায়। তার পরও এভাবে রেলপথ পাড়ি দেওয়া বিপজ্জনক। অনেকে মুঠোফোনে কথা বলেন, বা কানে ইয়ারফোন লাগানোর কারণে ট্রেন আসার শব্দ শুনতে পান না। কেউবা রেলপথে বসে থাকেন বা হাঁটাহাটি করেন। অথচ এর সবই আইনে নিষিদ্ধ। রেলওয়ে আইনে রেলপথের দুই পাশে ২০ ফুট পর্যন্ত ১৪৪ ধারা জারি আছে। রেলপথের ওই এলাকায় অবস্থান দন্ডনীয়। রেলপথজুড়ে মানুষের এই অবস্থানের বিরুদ্ধে আইনের প্রয়োগ নেই। এমনকি গরু-ছাগলের বিচরণও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অথচ অনেকের বিষয়টি জানা নেই।

দেশে রেলক্রসিং অরক্ষিত হওয়ার বড় কারণ পর্যাপ্ত গেটকিপারের অভাব। একটি ক্রসিংয়ে সাধারণত তিন থেকে ১২ জন গেটকিপার থাকা দরকার; কিন্তু তা নেই। এ ছাড়া স্থায়ী গেটকিপারও কম। প্রকল্পের মাধ্যমে কিছু গেটকিপার আছেন; অনিয়মিত বেতনে চাকরি করেন তারা। ফলে তাদের মধ্যে অসন্তোষ ও অবহেলা রয়েছে। বেতনের দাবিতে তারা সম্প্রতি আন্দোলনও করেছেন। গেটকিপারদের একটা বড় অংশ হতাশায় ভুগছেন। কারও কারও কর্মঘণ্টা ১৬ ঘণ্টা; নেই থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও। তাই নিজ দায়িত্ব অন্যকে দিয়ে চালিয়ে নেওয়ার প্রবণতা আছে। তা ছাড়া ‘ইন্টারলকিং’ ও ‘নন-ইন্টারলকিং’ পদ্ধতি বিদ্যমান রেলে। এমন অনেক ক্রসিং আছে, যেখানে ট্রেন আসার বার্তা পান না গেটকিপাররা। অনুমানের ভিত্তিতে বা ট্রেন আসার শব্দ শুনে তারা যান চলাচল বন্ধ করে দেন। বিলম্বে ট্রেন এলে অনেক সময় গেটবার দিতে দেরি হয়ে যায়। কিছু স্থান আছে, যেখানে গেটকিপার নেই। সেখানে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দায়িত্ব সেরেছে রেল কর্তৃপক্ষ।

এর আগে স্বয়ংক্রিয় গেটকিপার বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। যন্ত্রের সাহায্যে ট্রেন আসার বার্তা দেওয়া বা পদক্ষেপ নেয় বাংলাদেশ রেলওয়ে; কিন্তু এ উদোগ কাজে আসেনি। ওই যন্ত্র অকেজো করে ফেলেছে সাধারণ মানুষ। রেললাইনের ওপর উড়ালপথ নির্মাণে এক যুগের বেশি সময় ধরে আলোচনা চলছে। সওজ অল্প কিছু মহাসড়কের উড়ালসড়ক নির্মাণ করেছে। অন্যগুলোতে উড়ালসড়ক নির্মাণ কে করবে, সেটাই ঠিক করতে পারছে না সংস্থাগুলো। ফলে রেলক্রসিং অরক্ষিতই থেকে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেলক্রসিং নিরাপদ করার দুটি উপায় আছে। রেললাইনের ওপর দিয়ে যাওয়া সড়কে উড়ালপথ নির্মাণ করা কিংবা ট্রেন আসার সময় যানবাহন আটকে দেওয়ার জন্য পথরোধক (ব্যারিকেড) বসানো এবং ট্রেন এলে তা সময়মতো নামিয়ে যানবাহনের চলাচল বন্ধ রাখার জন্য পাহারাদার নিয়োগ। সওজ প্রতিবছর ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ করছে। ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়নে বরাদ্দ ছিল প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। রেলওয়ে গত এক যুগে রেললাইন তৈরি ও কেনাকাটায় ৬৭ হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে; কিন্তু রেলক্রসিংয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কেউ দায়িত্ব নিতে চাইছে না।

নিয়ম অনুযায়ী নতুন রেললাইন তৈরি করে প্রথম ট্রেন চালানোর ১০ বছরের মধ্যে এর ওপর দিয়ে কোনো সড়ক গেলে তা সুরক্ষিত রাখার দায়িত্ব রেলের। এর পর কোনো সড়ক নির্মাণ হলে তা আগে রেল কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। সড়কের কারণে তৈরি রেলক্রসিংয়ে পথরোধক ও পাহারাদার দিয়ে তা সুরক্ষা করার দায়িত্ব সড়ক নির্মাণকারী সংস্থার। এটা না করলে রেল এসব ক্রসিংয়ের অনুমোদন নেই বলে বিবেচনা করে। এগুলোতে পাহারাদার কিংবা প্রতিবন্ধক থাকে না, যা পুরোপুরি অরক্ষিত; কিন্তু বিভিন্ন সংস্থা রেলপথ ধরে সড়ক নির্মাণ করে অনুমোদন ছাড়াই। রেলে মোট ১৪৬৮টি লেভেলক্রসিং আছে। এর মধ্যে ৫৬৪টিতে গেটকিপার আছে, ৯০৪টিতে নেই। রাজস্ব খাত ছাড়াও প্রকল্পের আওতাভুক্ত গেটকিপারের মধ্যে পূর্বাঞ্চলে ১০৩৮টি এবং পশ্চিমাঞ্চলে ৮৫১টি পদ রয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় গেটকিপারদের চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। এ নিয়ে আন্দোলনের পর এখন তাদের চাকরি স্থায়ীকরণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব রেলপথ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এর পর প্রধানমন্ত্রীর কাছে সারসংক্ষেপ পাঠানো হবে মন্ত্রণালয় থেকে।

রেলের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) কামরুল আহসান বলেন, পাহারাদারের ভুলে দুর্ঘটনা হলে অবশ্যই শাস্তি হবে। তবে অনেক চালক বেপরোয়া মনোভাব দেখিয়ে পার হতে গিয়েও দুর্ঘটনায় পড়ছেন। আর এজন্য দরকার সচেতনতা। সচেতনতা বাড়াতে ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে। আমরা সে কাজটি করছি। এর অংশ হিসেবে স্কাউটের সহযোগিতা নেওয়ারও চিন্তা করেছি।

বর্তমানে অবৈধ লেভেলক্রসিং রয়েছে ১৩২১টি। এরমধ্যে পূর্বাঞ্চলে ৭৭১টি আর পশ্চিমাঞ্চলে ৫৫০টি। প্রতিষ্ঠান হিসাবে বিবেচনা করলে ধরতে হবে এলজিইডির ৪৫৮টি, ইউনিয়ন পরিষদের ৫০২টি, সওজের ১২টি, সিটি করপোরেশনের ৫৪টি, উপজেলা পরিষদের ৯টি, পৌরসভার ১১৬টি। এ ছাড়াও অন্যান্য ক্যাটাগরিতে ১৭০টি লেভেলক্রসিং রয়েছে। এসব স্থানে কোনো গেটম্যান নেই। ২০১৫ সাল থেকে রেলক্রসিং নিরাপদ করতে ১৯৬ কোটি টাকা খরচ করেছে রেলওয়ে। দুটি প্রকল্পের আওতায় রেলের পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে রেলক্রসিং উন্নয়ন করা হয়েছে। এর আওতায় পাহারাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৫৩২ জন। রেলক্রসিং উন্নয়নের মধ্যে প্রতিবন্ধক বসানো ও পাহারাদারের জন্য ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এর পরও রেলক্রসিং নিরাপদ হয়নি। অভিযোগ রয়েছে- গেটম্যান বা গেটকিপারদের বড় অংশই অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া। অনেক জায়গায় ২৪ ঘণ্টার জন্য গেটম্যান নেই।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020  E-Kantha24
Technical Helped by Titans It Solution