শনিবার, ২৮ মে ২০২২, ১০:৪৭ অপরাহ্ন

স্টাফ রিপোর্টারঃ ‘দিনের আলো কমে আসছে, পাখিদের সঙ্গে আমাদেরও ফেরার পালা। জঙ্গলের রাস্তায় খুবই আস্তে গাড়ি চলছিল, হঠাৎ দেখি গাড়ির সামনে এক হিমালয়ান মোনাল রাস্তা পার হচ্ছে। গাড়ি থেকে নামতে নামতেই সে জঙ্গলে হারিয়ে গেল। তাপমাত্রা ধীরে ধীরে নামছে।’ হিমালয়ের কোল ঘেঁষা জনপদ থেকে এক পর্যটক জানালেন পায়ে পায়ে শীত এগিয়ে আসার পদধ্বনি আর প্রকৃতি ও পরিবেশের বদলে যাওয়ার কথাগুলো।

হিমালয় সন্নিহিত এলাকাগুলো গ্রীষ্মঋতুতে শীতল পরশের জন্য উপযুক্ত স্থান হলেও শীতে সেখানে পাওয়া যায় শ্বেতশুভ্র চরাচরের আরেক আমেজ। ‘থ্রি ইডিয়টস’ ছবির ফারহান আর রাজুর কথাও মনে পড়ে তখন। সব কাজ ফেলে প্রিয় বন্ধু আমির খান তথা র‍্যাঞ্চোর জন্য চতুরকে নিয়ে তারা গাড়ি ছুটিয়েছিল দিল্লি থেকে সিমলা। খুঁজতে খুঁজতে সিমলা থেকে ৪০ কিমি দূরে চেল প্যালেসে পৌঁছে গিয়েছিল তারা।

মহামারির কারণে এক বছর ঘরবন্দি থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে উঠা লোকজনও গ্রীষ্ম ও শীতের সন্ধিক্ষণে ছুটছেন হিমালয়ের নানা হিলস্টেশনে। বিশেষত সবার আকর্ষণ ছবির মতো সাজানো শৈলশহর সিমলা। বায়ু দূষণে দমবন্ধ দিল্লির লোকজনও শ্বাস নেওয়ার আশায় ছুটছেন কাছের সিমলায়।

দিল্লি থেকে সিমলা যেতে হয় হরিয়ানা ও পাঞ্জাব ছুঁয়ে। প্রথমে দিল্লি থেকে পানিপথ। ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে পানিপথ থেকে কারনাল। তারপর ঐতিহাসিক কুরুক্ষেত্র পেরিয়ে এক ঘণ্টা কুড়ি মিনিট পর পাঞ্জাবের ক্যান্টনমেন্ট সিটি আম্বালায়।

এ পর্যন্ত আসতে আসতে নির্ঘাত বেশ খিদে পেয়ে যাবেই। গাড়িতে বসেই চা, পাস্তা, পরোটা সহযোগে পনির আর আলুভাজা খাওয়াই তখন দস্তুর। কিছুক্ষণের মধ্যে গাড়ি আবার গতিশীল হলে খুবই ভাল রাস্তায় জিরাখপুর পর্যন্ত কোনও অসুবিধে হবে না। তারপর থেকে অবশ্য ছোটখাটো যানজট। একটু বেশি সময় যাবে পথে। সামনেই চণ্ডিগড় শহরের রাস্তা এড়িয়ে ডান দিকের হিমালয়ান এক্সপ্রেসওয়ে ধরতে হবে।

হিমালয়ান এক্সপ্রেসওয়ে এত ভাল রাস্তা যে মনে হবে, এ পথে গাড়ি চলা যেন শেষ না-হয়! দৃশ্যপট ক্রমশ পাল্টাবে, ঢেউখেলানো পাহাড় দেখা যাবে, বাড়বে পার্বত্য সবুজের ঘনত্ব। গাড়ির কাচ নামাতেই ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা চোখেমুখে। গাড়ির সানরুফ দিয়ে দেখা যাবে নীল আকাশ, একমুঠো শীত-মাখানো রোদ্দুরও ঢুকে পড়বে একেবারে গাড়ির ভেতরে।

হিমালয়ের টানে এভাবেই ভ্রমণে বের হওয়ার আনন্দ উপভোগ করেন পর্যটকরা। নগরীর ঘেরাটোপের বন্দিত্ব ছিঁড়ে মনেপ্রাণে পৌঁছে যান অরণ্য সবুজের পার্বত্য পাকদণ্ডীতে। কখনও রোমন্থন করেন, বহু আগের এমনই কোনও এক শীতের সকাল। ঐতিহাসিক টয় ট্রেনে চেপে কালকা থেকে সিমলা যাওয়ার স্মৃতি এখনও রোমাঞ্চিত করে বহুজনকেই। মনে ভেসে উঠে সোনওয়ারা, কোটি, বারোগ, সোলান, ধরমপুর, কান্দাঘাট, সিমলা।

পার্বত্য সুন্দরী সিমলা নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রকৃতির শ্যামলিমা। আবার সেখানকার প্রচলিত অর্থে শ্যামলা কথাটির মানে নীল বাড়ি। সিমলার জাখু শৃঙ্গে এক ফকির একটি নীল বাড়ি তৈরি করেছিলেন। সেখান থেকে সিমলা। আবার শ্যামলার অর্থ নীল নারীও ধরা হয়। হিন্দু দেবী কালীর আরেক নামও শ্যামলা।

সিমলা বা ইংরেজিতে Shimla ভারতের হিমাচল রাজ্যের সিমলা জেলার একটি শহর ও পৌর কর্পোরেশনাধীন এলাকা। এটি হিমাচল রাজ্যের রাজধানীও। ভারতের ২০১১ সালের আদম শুমারি অনুসারে সিমলা শহরের জনসংখ্যা ৮১৪,০১০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৫৭% এবং নারী ৪৩%। তবে, এরচেয়ে বহু মানুষ পর্যটক রূপে এখানে আসেন প্রতি বছরই। এখানে সাক্ষরতার হার ৮৩.৬৪%। পুরুষদের মধ্যে সাক্ষরতার হার ৮৯.৫৯% এবং নারীদের মধ্যে এই হার ৭৭.১৩%। সারা ভারতের সাক্ষরতার হার ৫৯.৫%, তার চাইতে সিমলা এর সাক্ষরতার হার বেশি।

সিমলা শহরের জনসংখ্যার ১০.০২% হল ৬ বছর বা তার কম বয়সী। বিশেষত, অভিজাত ও উচ্চপদাধিকারী লোকজন অবসরজীবনে বাড়ি বানিয়ে বা কিনে সিমলার অনিন্দিত প্রকৃতির বুকে বসবাস করেন। ফলে এখানকার অধিবাসীগণ শিক্ষিত, মার্জিত, রুচিশীল ও সংস্কৃতিবান।

প্রাকৃতিক সিমলা যৌবন ও সৌন্দর্য লাভ করেছে ঔপনিবেশিক শাসকদের হাত ধরে। ভারত শাসনকারী ব্রিটিশরা সিমলায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী তৈরি করেন। মূল রাজধানী দিল্লির প্রচণ্ড গরমের সময় সাহেবরা কয়েক মাস এসে থাকতেন সিমলায়। সঙ্গে নিয়ে আসতেন লোকজন, কর্মচারী, অস্থায়ী অফিস-আদালত। ব্রিটিশ আমলে বাংলায়ও যেমনভাবে গ্রীষ্মকালে রাজধানী কলকাতা থেকে তুলে নেওয়া হতো দার্জিলিং-এ।

গ্রীষ্মকালীন রাজধানীর মর্যাদা হারালেও সিমলার পরতে পরতে রয়েছে পুরনো কলোনিয়াল আভিজাত্যের দ্যুতিময় নগর বিন্যাস। ভারতের হিমাচল প্রদেশের রাজধানী রূপে সেই অতীত গৌরব এখনও সেখানে বহাল। শহরে পর্বতময়তা, রোপওয়ে, ওক ও পাইনের বীথি এবং রোডোডেন্ড্রন বনের ল্যান্ডস্কেপে ঔপনিবেশিক শৈলীর ভবনগুলো নস্টালজিক ছোঁয়ায় সবাইকে মোহিত করে।

সিমলার ঐতিহাসিক রেলওয়ের স্থাপনা, পুরানো চার্চ ইত্যাদি ভবনের সুন্দর রঙিন কাচের জানালা দিয়ে নান্দনিকতার দৃশ্যাবলী উন্মোচিত হয়। আরও আছে, অবজার্ভেশন লজ অব অ্যামবিভটরি হিল। রয়েছে ছবির মতো সাজানো বাড়ি, পাহাড়ে হাঁটাপথ, পলো, গলফ ও অন্যান্য খেলার প্রচুর আয়োজন এবং অনেকগুলো নামজাদা কনভেন্ট ও বোডিং স্কুল।

সিমলা ভ্রমণের অন্যতম সেরা জায়গা হল সামার পাহাড়, যা সুন্দর শহরটির বিখ্যাত রিজ থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এই পাহাড়টি সংখ্যাহীন বিশাল সবুজ বৃক্ষ দ্বারা ভরপুর। ভেতরে গেলে সবুজে হারিয়ে যেতে হয় আর উপর থেকে পাহাড়ের কোলে চমৎকার সবুজাভ আচ্ছাদনের মতো দেখা যায়। গ্রীষ্মকালীন পাহাড়টি আসলে সাতটি পাহাড়ের একটি অংশ বিশেষ। সিমলার সৌন্দর্যকে যা সমৃদ্ধ করেছে।

ব্রিটিশ কর্তৃক নির্মিত সিমলার আইআইএএস স্বাধীনতার পর প্রাথমিকভাবে ভারতীয় রাষ্ট্রপতির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল একটি মানবিক ও কলা শিল্পে অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে। বিল্ডিংটি একটি নমনীয় সিস্টেমের সাথে একটি শাস্ত্রীয় স্থাপত্য নকশার অপূর্ব নিদর্শন স্বরূপ। সিমলা ভ্রমণে এমন স্থাপনা ও স্থানের অভাব নেই। বিভিন্ন পয়েন্ট, সুদীর্ঘ লন, ব্রিটিশদের হাতে নির্মিত গথিক স্থাপত্যকলা, প্রকৃতি ও স্থাপনার সমান্তরাল অবস্থানের শৈলী সিমলাকে করেছে মোহনীয়। সিমলার পার্বত্য-বনানীর শৈলাবাসে ভ্রমণ এবং সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত কেবল চোখের দেখা বা অনুভবের বিষয় মাত্র নয়, ‘লাইফ টাইম মেমোরি’ হিসেবে বুকে ধারণা করার অমলিন স্মৃতিস্বরূপ।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020  E-Kantha24
Technical Helped by Titans It Solution