বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ০৬:১১ পূর্বাহ্ন

রাজনীতির দেউলিয়াপনা প্রকট হয়ে উঠছে

আবুল মোমেন::
মোটামুটি চলনসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের সদিচ্ছা ও সামর্থ্য। বর্তমানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রয়েছে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামের সুদীর্ঘ ঐতিহ্য। অপর প্রধান দল বিএনপিও এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের সংগ্রামে শরিক ছিল। কিন্তু দুই দলের মধ্যে বিএনপির গঠনতন্ত্রেই দলপ্রধানের একচ্ছত্র ক্ষমতা স্বীকৃত থাকায় সাংগঠনিককর্মকাণ্ডে দলটিগোড়া থেকেই গণতান্ত্রিক রীতি মেনে চলেনি। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক রীতিতে চলার কথা এবং দীর্ঘদিন সেভাবে চলেছে, কিন্তু ক্রমে এই দলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণে দলনেতার একচ্ছত্র ভূমিকাই প্রকট হয়ে উঠেছে। ছাত্রলীগসহ দলের অঙ্গসংগঠনগুলোর কমিটি গঠনেও আওয়ামী লীগপ্রধানের সিদ্ধান্তের মুখাপেক্ষী সংশ্লিষ্ট সবাই। বাস্তবতা হলো তাঁর হস্তক্ষেপ ছাড়া উচ্চাভিলাষী পদপ্রার্থীর দ্বন্দ্ব-সংঘাত ঠেকানো যাবে না।

আমাদের মনে পড়বে, ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল সামনে রেখে বিবদমান উপদলীয় কোন্দল থামানোর ফর্মুলা হিসেবে প্রিয়জন হারানো শেখ হাসিনাকে দিল্লি থেকে ঢাকায় আনার ব্যবস্থা করা হয়। সেই থেকে দীর্ঘ ৩৭ বছর তিনিই আওয়ামী লীগের সভানেত্রী। অর্থাৎ আওয়ামী লীগের ৭০ বছরের ইতিহাসে তাঁরই নেতৃত্বের কাল চলছে সবাইকে ছাপিয়ে। সম্ভবত বাস্তবতা হলো তিনি সরে দাঁড়ালে দলীয় ঐক্য বজায় রাখা আজও সম্ভব নয়। দলীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে তিনি বিকল্পহীন।

সম্ভবত দুই দলেই মূল নেত্রীর অবর্তমানে বা পরিবর্তে তাঁদের সন্তান বা উত্তরসূরিদের মাধ্যমেই দলীয় ঐক্য ধরে রাখার চেষ্টা করা হবে। তবে মনে হয় না একালে সে কৌশল সম্পূর্ণ সফল হবে। কিছু উচ্চাভিলাষী নেতা যেমন, তেমনি কিছু ত্যাগী নেতাও আলাদা পথে চলতে চাইবেন। আর সংগঠনের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার চর্চা ও ব্যবস্থা না থাকায় এ পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হবে কঠিন। অর্থাৎ তখন দলগুলোতে ভাঙন দেখা দেওয়ার আশঙ্কাই বেশি।Eprothomalo

১৯৭৫-এর পরে আওয়ামী লীগের ভাঙন দেখেছি আমরা। শেখ হাসিনা আসার পরও বাকশালের পুনরুজ্জীবন দেখেছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মূল স্রোতে সবাই ফিরে এসেছেন। বিএনপিতেও দল ছেড়ে গিয়ে কেউ তেমন সুবিধা করতে পারেননি। আর বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, বড় দলের রাজনীতিসংশ্লিষ্ট সবাইকে অর্থবিত্তের এক নিরাপদ উচ্চতায় পৌঁছে দেয়—সব সময় এ উপার্জন বৈধ না হলেও। অনেক উচ্চাভিলাষী ভাগ্যান্বেষী এসব দলে যোগ দিচ্ছেন, ঢুকে পড়ছেন। আপাতত রাজনীতিসংশ্লিষ্টদের ব্যক্তিগত বা সামষ্টিক অ্যাজেন্ডায়জনস্বার্থ বা নাগরিক অধিকারের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পায় না। যেভাবে কোটা সংস্কার আন্দোলন ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা নিন্দিত, সমালোচিত এবং রাষ্ট্রীয় পীড়নের শিকার হয়েছেন, তা ইস্যুর ন্যায্যতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। কিন্তু রাজনৈতিক অঙ্গন এ নিয়ে ন্যায়সংগত সাড়া দেয়নি।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরে যে তিনটি জনপ্রিয় আন্দোলনে সারা দেশের জনগণ সাড়া দিয়েছে, সেগুলো পর্যবেক্ষণ করলে রাজনৈতিক অবক্ষয় ও অকার্যকারিতা প্রমাণ হয়। গণজাগরণ মঞ্চ, কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং চলমান নিরাপদ সড়কের আন্দোলনের মধ্যে অনেক সাধারণ মিল রয়েছে। তিনটি আন্দোলনই ছাত্র-তরুণদের দ্বারা সংগঠিত, স্বতঃস্ফূর্তভাবে তারা সাড়া দিয়েছে, এসব ছাত্র-তরুণ অরাজনৈতিক, মূলত সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেই এসব আন্দোলন ছড়িয়েছে, সাধারণ মানুষ আন্দোলনের মূল ইস্যুগুলোর ন্যায্যতা স্বীকার করেছে। আবার প্রতিবারই দেখা যাচ্ছে দেশের সবচেয়ে অভিজ্ঞ রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকলেও এবং তাদের অধিকাংশ নেতা রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামের পোড় খাওয়া অভিজ্ঞ মানুষ হলেও তাঁরা কোনো আন্দোলন যথাযথভাবে সামলাতে পারেননি।

গণজাগরণ মঞ্চের অভূতপূর্ব সাফল্যেই শেষ পর্যন্ত একাত্তরের মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত হয়েছিল। কিন্তু আন্দোলনটির সঙ্গে ছাত্রলীগ নেতৃত্ব সহাবস্থান করতে পারেনি। এদিকে কোটা সংস্কারের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে অনেক ছাত্রলীগ কর্মী যোগ দেওয়া সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত এর নেতারা সরকারি ছাত্রসংগঠন হিসেবে আন্দোলন দমনে পাকিস্তান আমলের এনএসএফের ভূমিকায় নেমেছিল। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এই আন্দোলন ও নেতা-কর্মীদের ভাবমূর্তিতে কালিমা লেপনের চেষ্টা হয়েছে। এসবই রাজনৈতিক দেউলিয়াপনার লক্ষণ।

এবার সড়কে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রাস্তায় নেমে এসেছে স্কুলের ছাত্ররা। তাদের আন্দোলন ও দাবিগুলোর প্রতি সাধারণ মানুষ জোরালো সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। আদতে সড়ক, যানবাহন চলাচল ও গণপরিবহনে বহুদিন ধরেই নৈরাজ্য চলছে। আমাদের দেশে সড়ক, যান চলাচল ও যাত্রীর তুলনায় দুর্ঘটনা এবং মৃত্যুর হার বেশি। সাধারণত নগরের অভ্যন্তরে সুশৃঙ্খল ট্রাফিক ব্যবস্থা এবং কিছুটা নানা যানবাহনের ভিড় থাকায় সব গাড়িরই গতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। তাই শহরের ভেতরে দুর্ঘটনার হার হাইওয়ের তুলনায় সাধারণত কম হয়। আর হলেও দুর্ঘটনায় ক্ষতিও কম হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার ৩৬ শতাংশই হয় শহরের ভেতরে, আবার শহরের ভেতরের দুর্ঘটনার মধ্যে ৭৪ শতাংশই ঘটে রাজধানী ঢাকায়। আর এসব
দুর্ঘটনায় প্রায়ই প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে, যা স্বাভাবিক নয়। গত এক বছরে ঢাকা মহানগরীতে সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৪১৭ জন। এটা অতি উচ্চ হার।

যে শহরে গাড়ি চলে হাঁটার গতিতে, তিন-চার কিলোমিটার পাড়ি দিতে তিন ঘণ্টাও পেরিয়ে যায়, একটি ট্রাফিক সিগন্যালে কখনো আধা ঘণ্টার বেশি অপেক্ষায় থাকতে হয়, যেখানে অহরহ উল্টো দিকে যান চলাচল করে, ফ্লাইওভারের মুখে গণপরিবহনে যাত্রী ওঠানামা করে, ফ্লাইওভারেই পাল্লা দিয়ে ওভারটেক করে, সেখানে দুর্ঘটনা স্বাভাবিক। আর এত নৈরাজ্য সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা, অপারগতা দেখে দেখে মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলে তাদের দোষ দেওয়া যাবে না।

তাই একটি সড়ক দুর্ঘটনা, দুটি মৃত্যু ও নয়জনের আহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্রদের এই আন্দোলন এমন ব্যাপক জনসমর্থন পেয়েছে। রাজপথে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য অবিলম্বে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, শিশু ও জনগণ সেই বার্তাই দিয়েছে। ছাত্ররা পথে নেমে উল্টো যাত্রী থামিয়েছে, সরকারের প্রবীণ মন্ত্রীকে বাধ্য করেছে সঠিক পথে যেতে, বিশৃঙ্খলভাবে চলতে অভ্যস্ত রিকশাকে কাতারবন্দী করে চলতে শিখিয়েছে, আর বিভিন্ন গাড়ির কাগজপত্র চেক করে দেখেছে গণপরিবহনের বড় একটি অংশের ফিটনেস থেকে চালকের লাইসেন্স ঠিক নেই।

আমরা বলি না ছাত্রদেরই এ কাজ করণীয়, কিন্তু কর্তৃপক্ষ যখন বছরের পর বছর ব্যর্থ হতে থাকে, পরিস্থিতি অসহনীয় পর্যায়ে চলে যায় এবং খেসারত দিতে মারাত্মক দুর্ঘটনা ও শারীরিক-মানসিক কষ্টের শিকার হতে হয় সাধারণ মানুষকে, তখন একসময় সাধারণজনকেই এগিয়ে আসতে হবে। বড়দের নিরাপদ সড়কের আন্দোলন, গোলটেবিল, জরিপ, পরামর্শ, সুপারিশ ব্যর্থ হওয়ার পর এবার স্কুলছাত্ররাই পথে নেমেছে গত ২৯ জুলাইয়ের দুর্ঘটনার প্রেক্ষাপটে। ছাত্ররা এখন আশু ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি তুলছে আর করণীয় সম্পর্কে কিছু দৃষ্টান্তমূলক কাজ করে দেখাচ্ছে। তাদের মানুষ সমর্থন দিয়েছে বিপুল কষ্ট সত্ত্বেও।

হ্যাঁ, দেখা যাচ্ছে আবার সবচেয়ে অভিজ্ঞ রাজনৈতিক দলের সরকার বিষয়টিগণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারায় মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। সে পথে নৌমন্ত্রীর পদত্যাগ একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ হতে পারত এবং ছাত্রদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী দ্রুত অ্যাকশন প্ল্যান দিতে পারতেন। সরকারের কিছু মন্ত্রী আন্দোলন ও দাবির যাথার্থ্য স্বীকার করলেও কেন যেন নিষ্ক্রিয়ই রয়েছেন। আর প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী সাধারণ ছাত্রদের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে ছাত্রলীগের পক্ষে কী করা সম্ভব তা অনুমেয়। কারণ, তারা ক্ষমতার অংশ হিসেবে কর্তৃত্ব ও খবরদারিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে, হুকুমের ভাষায় কথা বলে এবং জবরদস্তির মাধ্যমে অন্যদের মুখ ও আন্দোলন বন্ধ করতেই সক্ষম।

তবে দেশে রাজনীতির শূন্যতা ও অবক্ষয় চলতে থাকলে মাঝে মাঝেই বিভিন্ন ইস্যুতে ছাত্র-তরুণদের অরাজনৈতিক আন্দোলনেই জনগণের ন্যায়সংগত দাবিগুলো উঠে আসবে। কেননা সমাজ কোনো না কোনোভাবে অন্যায় ও অব্যবস্থার প্রতিবাদ তো জানাবেই।

আবুল মোমেন, কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক
সুত্র-প্রথম আলো

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020  E-Kantha24
Technical Helped by Titans It Solution