বুধবার, ০৫ অক্টোবর ২০২২, ০৪:১৮ পূর্বাহ্ন

তিস্তা-ধরলার হাসি কান্নায় অনিশ্চিত দিনাতিপাত

স্টাফ রিপোর্টারঃ প্রতি বছর আলোচনায় থাকে তিস্তা। বর্ষা মৌসুমে আলোচ্য তিস্তার দুঃখ দুর্দশা আর শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার চরাঞ্চলের হাসির বন্দনা করতে গিয়ে অন্যসব ছোট নদীর মতই হারিয়ে যায় ধরলার কথা।

তিস্তার বাম তীরে আর ধরলার ডান তীরে লালমনিরহাট জেলা। তিস্তার বাম তীরে সবটুকু অঞ্চল ছুঁয়ে গেছে তিস্তা। অপর দিকে ধরলা ছুঁয়েছে জেলার পাটগ্রাম আর সদর উপজেলা। তিস্তার অপর দিকে রংপুর আর নীলফামারী জেলা। ধরলার অপর দিকে ভারত আর কুড়িগ্রাম জেলা। কোথাও কোথাও ধরলা ভারত বাংলাদেশকে ভাগ করে বয়ে গেছে।

তীস্তা-ধরলার জনসাধারণ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য, কৃষি বিভাগ, চা বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট দের সাথে কথা হয়।তিস্তা-ধরলা বছর বছর যেমন হারিয়েছে নিজ নাব্যতা আর কেড়ে নিয়েছে ভুক্তভোগীদের সহায় সম্বল আর বেঁচে থাকার শেষ সম্বলটুকুও।

বর্তমানে তিস্তা তার বুকে ৬০ এর অধীক চর নিয়ে বয়ে চলেছে। ধরলা দিক পাল্টিয়ে গড়ে তুলেছে স্থায়ী বেশ কিছু চর। ভুক্তভোগীরা দাবি করেছেন, নদী দুটি গতিপথ পাল্টিয়েছে বহুবার।

সরেজমিনে ৭০ বছর বয়সি করিম উদ্দিন প্রতিবেদককে বলেন, যে অঞ্চলে ধরলা নদীকে দেখিয়েছেন তা এখন কুড়িগ্রাম জেলার অংশ। ব্রিজ হওয়ার কয়েক বছর ঐ পানি প্রবাহটিই লালমনিরহাট অংশে ছিল। এখন আবার ব্রিজ এলাকায় সরে গেছে পানি প্রবাহ। কিন্তু সেই নদীর ডান তীর ঠিকই লালমনিরহাট অংশে রয়েছে। পরিবর্তন শুধু ব্রিজ মুখে।

হাতিবান্ধার হায়াত জানান, তার বাপ-দাদার ৪৩ একর জমি নদী গর্ভে। তিনি বলেন, তিস্তা নদী যেখানে ছিল সেখান দিয়ে যাবে। আমার বাপ-দাদার সম্পত্তি ভেঙে কার ওপর দিয়ে কেন তিস্তা যায়?

তিস্তা ধরলার পানির বিপৎসীমার রেকর্ড পরিবর্তিত হয়েছে কয়েকবার। পানি উন্নয়ন বোর্ড লালমনিরহাট দপ্তর রেকর্ড পরিবর্তনের হিসাব দিতে পারেনি। তবে, পানি উন্নয়ন বোর্ড রংপুরের বিভাগীয় উপ-প্রকৌশলী কৃঞ্চ কমল চন্দ্র সরকার জানান, গত ৫ বছরে তিনবার রেকর্ড পরিবর্তন করা হয়েছে। ৫২.২৫, ৫২.৪০ বর্তমানে ৫২.৬০ সেন্টিমিটার করা হয়েছে। তিনি ধরলার পানির রেকর্ড পরিবর্তনের হিসাব তাৎক্ষণিক জানাতে পারেননি। তবে বর্তমান রেকর্ড পাটগ্রামে ৫৮.৮৩ এবং লালমনিরহাট সদর অংশে ৩১.০৯ সেন্টিমিটার। বারবার রেকর্ড পরিবর্তনই বলে, নদী দুটি কতোটা ভরাট হয়েছে।

দোয়ানী ব্যারাজ প্রকল্পের উজানে ২৫ কিলোমিটার এবং ভাটিতে ব্যারাজ থেকে তিস্তা কাউনিয়া সড়ক সেতু পর্যন্ত ৭৩ কিলোমিটার। পাটগ্রামে ধরলার ২৯.৫ কিলোমিটার আর লালমনিরহাট সদরে ১৮.৬ কিলোমিটার অংশ লালমনিরহাট জেলাতে রয়েছে।

চা বোর্ড লালমনিরহাটের প্রকল্প পরিচালক আরিফ খান বলেন, ধরলার লালমনিরহাট অংশ চা চাষের জন্য বেশ উপযোগী। বিশেষ করে পাটগ্রামের ধরলার দুধারে চা চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এই বিস্তৃর্ণ অঞ্চলের আবহাওয়া চা এর জন্য খুবই উপযোগী।

চা বোর্ড বলছে, বাংলাদেশে তিনটি প্রকল্প কাজ করছে। একটি হীলট্রেক্স, আর বাকি দুটি হল পঞ্চগর আর লালমনিরহাট। কিন্তু লালমনিরহাটের সমতলে বেশ বিছু বাগান হলেও, ধরলার ঐসব অঞ্চলের চাষীদের আকৃষ্ট করা যাচ্ছে না।

তিস্তার ব্যারাজ প্রকল্প থেকে কাউনিয়ার সেতু পর্যন্ত ৭৩ কিলোমিটারে শুষ্ক মৌসুমে ব্যাপক চাষাবাদের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এই মৌসুমে নদী বলতে এই ৭৩ কিলোমিটারে কিছু থাকে না। সমতল ভূমির মতো চরাঞ্চলগুলো পরেই থাকে। চাষ হয় ভূট্টা, বাদাম, আলু, গাজর, রসুন-পেঁয়াজ-মরিচ, কুমড়া, স্কোয়াস ছাড়াও বেশ কিছু ফসল। তবে, তামাকের চাষও উল্লেখযোগ্য।

কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে এতটাই শুষ্কতায় চলে যায়, যার কারণে কৃষকরা তাদের ফসলে চাহিদা মত সেজ দিতে পারেন না।

কৃষি দপ্তরের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা হামিদুর রহমান বলেন, তিস্তার চরগুলোতে ভুট্টার ভালো ফলন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যান্য ফসল চাষেও ভালো ফলন পাচ্ছে। আমরা চরের কৃষকদের পরামর্শ-সহযোগিতা দিয়ে আসছি।
ধরলার তীরবর্তি অঞ্চলের কুড়িগ্রাম অংশে কলার ভালো ফলন হচ্ছে। লালমরিরহাটে কলার চাষ না হওয়ার বিষয়ে তিনি জানান, একজন কৃষক অন্যদের দেখে চাষে উদ্বুদ্ধ হয়।

সরেজমিনে তিস্ততার চর এবং ধরলার তীরবর্তী অঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে চিকিৎসাসেবা গ্রহীতাদের নিদারুণ কষ্ট। চর থেকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে চিকিৎসা নিতে আসা একটি দুর্বিষহ বিষয়। অনেকেই চর থেকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে সঠিক সময়ে পৌঁছাতে পারেন না বলে জানান।

সিভিল সার্জন ডা. নির্মলেন্দু রায় অনুন্নত যোগাযোগের কথা স্বীকার করে বলেন, জেলার ইউনিয়নগুলোতে পুরোনো তিন ওয়ার্ড (সংরক্ষিত মহিলা সদস্যের এলাকায়) একটি করে কমিউনিটি ক্লিনিক আছে। কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। ইপিআই কার্যক্রম চলছে। মেজর কোন সমস্যা হলে তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসতে হয়। সেক্ষেত্রে যোগাযোগ ব্যবস্থাটি একটি বড় সমস্যা।

সম্প্রতি জেলা প্রশাসক আবু জাফর তিস্তার চরাঞ্চল পরিদর্শন করেছেন। তিনি জানান, চরাঞ্চলে এখন জীবন মান অনেকটাই এগিয়ে যাচ্ছে। তারা ফসল ফলাচ্ছে। পাকা বাড়িঘর হয়েছে। চিকিৎসা সেবা দিতে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো কাজ করছে।

প্রতিবেদন তৈরিতে তিস্তা নদী বাম তীর রক্ষা কমিটির সভাপতি (অব) মো. সরওয়ার হায়াত খানের সাথে আলাপ হয়। তিনি জানান, তিস্তা নিয়ে যে মহাপরিকল্পনার কথা বলা হচ্ছে তা কতোদিনে হবে তা বলা মুশকিল। তিস্তা নদী গতীপথকে বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে। এসব নিয়ে অনেক আন্দোলন করা হয়েছে। কাজ হয়নি। ওপর থেকে লোক এসে পরিদর্শন করছে, আশ্বাস দিচ্ছে, চলে যাচ্ছে। যদি কোনোদিন এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়, তাহলে আমূল পরিবর্তন হতে পারে এই এলাকার। কোনদিন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হবে, সেটি একটি বড় প্রশ্ন?

প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সাথে সাথে এখানে কৃষিজাত পণ্যের শিল্প গড়ে উঠতে পারে। বিভিন্ন ফিড মিল গড়ে উঠতে পারে। তিস্তার চরে প্রতি বিঘায় ৫০ মণের বেশি ভুট্টা উৎপাদিত হচ্ছে। মরিচ, পেঁয়াজ, মশলা জাতীয় ফসল নির্ভর এসব শিল্প গড়ে উঠলে অনেক সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাবে। সমাধান হবে বেকার সমস্যার।

অধ্যক্ষ (অবঃ) সরওয়ার এর একটি গবেষণা থেকে জানা যায়, তিস্তা ব্যারাজ হওয়ার পর এ পর্যন্ত ৬০ হাজার পরিবার সহায় সম্বল ভিটে মাটি হারিয়েছে। তিস্তার ভাঙনে ২ লাখ ২০ হাজার হেক্টর জমি বিলিন হয়েছে। লালমনিরহাটের ১৩টি ইউনিয়ন ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। নদীতে পানি না থাকায় ১ লাখ ২০ হাজার হেক্টর জমিতে ভুট্টা আর পেঁয়াজের চাষ হয়েছে। তিস্তা ব্যারাজ করার সময় বলা হয়েছিল— ব্যারাজের দুপাশে সিসি ব্লক ডাম্পিং করে এবং মাঝে মাঝে গ্রোয়িং নির্মাণ করে তিস্তাকে একটি নির্দিষ্ট চ্যানেল দিয়ে প্রবাহিত করা হবে। কিন্তু ব্যারাজের ডিজাইনার আইনুন নিশাদের স্বদিচ্ছার অভাবে তিস্তা নদীর বাম তীরে বাঁধ নির্মাণ করেনি।

বাম তীর রক্ষা কমিটি দাবি করছে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী বিভিন্ন অজুহাতে দামিদামি জিনিসপত্র সরিয়ে ফেলছে, যার আর্থিক মূল্য দিয়ে বাঁধ তৈরি করা যেত।

বর্ষাতে গড়ে ৭০ হাজার থেকে ১ লক্ষ দশ হাজার কিউসেক পানি আসে। এই পানি লালমনিরহাট অংশ দিয়ে প্রবাহিত হতে হতে নদীর নাব্যতা হারিয়েছে। নদীর প্রস্ত দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪ কিলোমিটার, যা দুই কিলোমিটার থাকার কথা। যার কারণেই মূলত বন্যা-ভাঙ্গনের সৃষ্টি হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড এর একজন প্রধান প্রকৌশলীর বরাত দিয়ে তাদের গবেষণায় দাবি করছে, তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের ৫% খরচ করলে তিস্তা ব্যারাজ থেকে কাউনিয়ার তিস্তা রেল সেতু পর্যন্ত ৭৩ কিলোমিটারে প্রটেক্টিভ বাঁধ দেয়া যেত।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020  E-Kantha24
Technical Helped by Titans It Solution