বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৩:৪১ অপরাহ্ন

টাইগারপাসকে বাদ দিয়ে এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প সংশোধনের দাবি

চট্টগ্রাম ব্যুরো: চট্টগ্রাম শহরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষায় টাইগারপাসকে বাদ দিয়ে নির্মাণাধীন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নকশা সংশোধনের দাবি জানিয়েছে ‘চট্টগ্রাম ঐতিহ্য রক্ষা পরিষদ’ নামে একটি সংগঠন। চট্টগ্রাম শহরের ইতিহাস-ঐতিহ্য রক্ষায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ দাবি করেছে সংগঠনটি।

রোববার (২২ আগস্ট) সকালে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের পক্ষ থেকে এ দাবি জানানো হয়েছে। সংগঠনের চেয়ারম্যান সাবেক মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী লিখিত বক্তব্য তুলে ধরেন।

চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসা-যাওয়ার পথে যানজট এড়াতে বিমানবন্দর থেকে নগরীর লালখানবাজার পর্যন্ত নির্মাণ করা হচ্ছে চার লেনবিশিষ্ট প্রায় সাড়ে ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। ৩ হাজার ২৫০ কোটি ৮৩ লাখ টাকার এ প্রকল্পটি ২০১৭ সালের ১১ জুলাই অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। ২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নেওয়া এ প্রকল্পের পাইলিং কাজের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রকল্পের অধীনে নয়টি জংশনে ২৪টি র‌্যাম্প (গাড়ি ওঠানামার পথ) থাকার কথা রয়েছে। চার লেনের এই এক্সপ্রেসওয়ের প্রস্থ হবে ৫৪ ফুট।

কিন্তু দেওয়ানহাট থেকে টাইগারপাস হয়ে লালখানবাজার পর্যন্ত এলাকায় সড়কের দু’পাশে সবুজ পাহাড় ঢেকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নামে উড়ালসড়ক নির্মাণ নিয়ে আপত্তি তোলেন পরিবেশবাদীরা। প্রকল্পের নকশা সংশোধনের দাবি ওঠে। তবে সেই দাবি আমলে না নিয়ে সিডিএ কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। এ অবস্থায় ‘চট্টগ্রাম ঐতিহ্য রক্ষা পরিষদ’ গঠন করে আন্দোলনে নেমেছেন বিশিষ্টজনেরা। তাদের দাবি, নগরীর দেওয়ানহাটের দক্ষিণে এক্সপ্রেসওয়ে সমাপ্ত করে টাইগারপাস থেকে লালখানবাজার পর্যন্ত সড়ক যেন উন্মুক্ত রাখা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আগামীর চট্টগ্রামের চেহারা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা গভীরভাবে শঙ্কিত। সরকার চট্টগ্রামে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে অনেক মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল হচ্ছে। পতেঙ্গা থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ নির্মিত হয়েছে। প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজ চলছে। আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার এবং মুরাদপুর- বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার নির্মিত হয়েছে। দোহাজারি-কক্সবাজার রেললাইন, পতেঙ্গায় বে-টার্মিনাল, মাতারবাড়ীত কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র ও গভীর সমূদ্রবন্দরসহ হাজার হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের কাজ চলছে।’

‘বিমানবন্দর থেকে লালখান বাজার পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মানকাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। চট্টগ্রামের উন্নয়নে এটি একটি মাইলফলক হিসেবে সংযোজিত হবে। তবে পরিবেশ-প্রকৃতি এবং ইতিহাস-ঐতিহ্য রক্ষার একান্ত তাগিদ থেকে আমাদের দাবি, টাইগারপাসের অপরূপ নান্দনিক সৌন্দর্য যেন ইট-পাথরের কংক্রিটের নিচে ঢেকে না যায়।’ টাইগারপাস মোড় থেকে লালখানবাজার পর্যন্ত অংশ প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়ার জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

সংগঠনের সদস্য সচিব সাংবাদিক জসীম চৌধুরী সবুজ সিআরবিতে হাসপাতাল প্রকল্প বাতিলের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে বলেন, ‘চট্টগ্রামের প্রাচীন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক সকল ঐতিহ্য রক্ষায় পরিষদ সোচ্চার থাকবে। তবে এই মুহূর্তে টাইগারপাসকে আদিরূপে রক্ষা করাটা চট্টগ্রামবাসীর নৈতিক দায়িত্ব। আশা করছি সরকার গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি বিবেচনায় নেবে।’

সংগঠনের কো-চেয়ারম্যান প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া বলেন, ‘প্রকল্প সংশোধন করা হলে টাইগারপাস যেমন রক্ষা পাবে, এক হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। একইসঙ্গে আমরা বিকল্প প্রস্তাব দিচ্ছি। সেটা হচ্ছে দেওয়ানহাট মোড় থেকে নৌবাহিনী সিনেমা হলের পাশ দিয়ে একটি পুরনো সড়ক আছে, যেটি দেওয়ানহাট ব্রিজ হওয়ার পর বন্ধ রাখা হয়েছে। সেটি আবার চালু করে সেখানে রেললাইনের ওপর ওভারপাস তৈরি করলে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে থেকে নেমে যানবাহন এই ওভারপাস হয়ে টাইগারপাস অতিক্রম করবে। বিদ্যমান রেলওয়ে ব্রিজটির যেহেতু মেয়াদ শেষ তা ভেঙ্গে সেখানেও নতুন করে আর একটি ওভারপাস তৈরি করা হলে সেটি দিয়ে আগ্রাবাদমুখী যানবাহন চলাচল করতে পারবে।’

‘বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে টাইগারপাসে আনতে হলে ধনিয়ালাপাড়া থেকে মনসুরাবাদের দিকে যে ফ্লাইওভারটি গেছে তার ওপর দিয়ে আনতে হবে। এজন্য ৮০ ফুট উচ্চতায় এটি নির্মাণ করতে হবে। বন্দর থেকে পণ্যবাহী যানবাহন এত উঁচুতে উঠতে গিয়ে প্রতিনিয়িত দুর্ঘটনার শিকার হবে বলে আমাদের আশঙ্কা। সুতরাং ভারী যানবাহনই যদি চলতে না পারে, তাহলে ৮০ ফুট উঁচুতে এক্সপ্রেসওয়ে বানিয়ে লাভ কী’— বলেন সুভাষ বড়ুয়া।

কো-চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘টাইগারপাস এলাকায় ফ্লাইওভার তৈরি করে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য ম্লান করে দেওয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন চট্টগ্রামবাসী। চট্টগ্রামের মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীও এই জায়গায় ফ্লাইওভার না করতে নকশা পরিবর্তনের অনুরোধ জানিয়েছেন সিডিএকে। এটি এখন নগরবাসীর প্রাণের দাবি।’

সংগঠনের সমন্বয়কারী এইচ এম মুজিবুল হক শুক্কুর, যুগ্ম সদস্য সচিব স্থপতি আশরাফুল ইসলাম শোভন, সাবেক কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, অধ্যাপক মুহম্মদ আমির উদ্দিন, সাবেক কাউন্সিলর জাবেদ নজরুল ইসলাম, হাবিবুর রহমান, সাংবাদিক আবসার মাহফুজ, এ কে জাহেদ চৌধুরী, হাসান মারুফ রুমী, সরোয়ার আমিন বাবু, নুরুজ্জামান, দীপ্তি দাশ, আবদুস সবুর খান, দিলরুবা খানম, আহমদ কবির সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020  E-Kantha24
Technical Helped by Titans It Solution