বুধবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২২, ০৯:৪০ পূর্বাহ্ন

গোল্ডেন এ প্লাস পেয়ে যমজ দুই ভাইয়ের চমক!

বাঘা (রাজশাহী) প্রতিনিধি:: নানা প্রতিকুলতার মধ্যেও এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল একই পরিবারের যমজ দুই ভাই আর এক বোন। পণ ছিল, যে করেই হোক এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করার। অভাব অনটনের সংসারে, সব বাধা পেরিয়ে সফলতাও পেয়েছে তারা। সবাইকে তাক লাগিয়ে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছে যমজ দুই ভাইয়ের একজন গোলাম রাব্বানী রাজন (বড়) আরেক ভাই গোলাম সাকলায়েন সাজন (ছোট)। বাঘা উপজেলার মনিগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছে যমজ দুই ভাই।

জিপিএ-৫ এর ভাগ্যের দুয়ার থেকে ফিরে গেছে বয়সে তাদের ১ বছরের বড় বোন উম্মে কুলসুম সিনথিয়া। মনিগ্রাম টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজ থেকে এসএসসি সমমানের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল উম্মে কুলসুম সিনথিয়া। ফিস কালচার এন্ড ব্রিডিং বিভাগে তার গ্রেড পয়েন্ট ৪.৭৯। আর্থিক অনটন, দারিদ্র্যের দৈন্যতা পেছনে ফেলে ওরা এগিয়ে গেছে সামনের দিকে। সংসারে উপার্জনক্ষম বাবা দুইবার ষ্টোক করে অসুস্থ হওয়ার পরে নিজের আগ্রহ, নানা (মায়ের বাবা) মামার সহযোগিতায় ফলাফল ভালো করেছে। অভাবের বাঁধ ভেঙ্গে সাফল্যের চ্যালেঞ্জ এখন সামনের দিকে।

শুধু এসএসসিতে নয়, অষ্টম শ্রেণীতেও গোল্ডেন এ প্লাস ও পঞ্চম শ্রেণীতে জিপিএ-৫ পেয়েছিল যমজ দুই ভাই গোলাম রাব্বানী রাজন ও গোলাম সাকলায়েন সাজন। অস্বচ্ছল সংসারে ছোট বেলা থেকে তাদের লেখা পড়ার আগ্রহ অনেক বেশী ছিল বলেই নিজেকে আলোকিত করে হাঁসি ফুটিয়েছে মা-বাবার মুখে। তবে দুঃচিন্তা এখন ভালো কলেজে ভর্তি নিয়ে।

গোলাম রাব্বানী রাজন ও গোলাম সাকলায়েন সাজন এর মামা হুমায়ন কবীর জানান, যমজ দুই ভাই পঞ্চম শ্রেণী পাশ করার পর থেকেই বাড়িতে টিউশনি করে তাদের ও তার বোনের লেখাপড়ার খরচ যুগিয়েছে। পাঁচ সদস্যর সংসার চলতো দিনমজুর বাবার উপার্জনের টাকা দিয়ে। এর মধ্যে দুইবার ষ্টোক করে তাদের বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ে। উপায়ান্তর না পেয়ে পার টাইম আমার ফার্নিচারের দোকানে কাজে লাগিয়ে দিই। সেই টাকা দিয়ে সংসার চালাতো আর বাড়িতে টিউশনি করে তিন ভাই বোনের লেখা পড়া খরচ যুগাতো। বাড়তি প্রয়োজনে আমি ও আমার বাবা আবু রায়হান (গোলাম রাব্বানী রাজন ও গোলাম সাকলায়েন সাজনের নানা) দেখভাল করি।

গোলাম রাব্বানী রাজন ও গোলাম সাকলায়েন সাজন জানান, তাদের স্বপ্ন বিসিএস ক্যাডারে ইনকাম ট্যাক্স অফিসার হওয়ার। তাদের বোন উম্মে কুলসুম সিনথিয়া জানান,যদি কোন বাঁধা না আসে, তাহলে স্বপ্ন পূরণে এইচএসসিতে ভালো ফলাফল অর্জন করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার।

গৃহিনী মা রুনা লাইলা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানান, কোন কোন দিন সকালে নাস্তা করার মতো খাবার ঘরে থাকেনি। বহুবার খেয়ে না খেয়ে স্কুলে যেতে হয়েছে। দুর্ভোগের মধ্যেও পড়াশোনা থেকে পিছপা হয়নি।

ছেলে-মেয়ের ফলাফলে অভিভূত হয়ে কষ্টের এসব কথা জানিয়ে মা রুনা লাইলা বলেন, বাড়ি ভিটার ৭/৮ কাঠা জমি ছাড়া আর কোন জায়গা জমি নাই। দিনমজুর স্বামীর উপার্জনের টাকা দিয়ে কোন রকমে সংসার চলে। পড়া লেখার জন্য বাড়তি কোন টাকা দিতে পারেনি তার বাবা। তারা নিজেই টিউশনি করে আর মামার ফার্নিচারের দোকানে কাজ করে পড়া লখার খরচ যুগিয়েছে। আমার সাংসারিক কাজেও সহযোগিতা করতে হয়েছে বড় মেয়ে উম্মে কুলসুম সিনথিয়াকে। আর্থিক অসচ্ছলতায়, তাদের পড়ালেখা নিয়ে শঙ্কিত মা-বাবা। তবে নিজের ইচ্ছা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চাই তারা ভাই-বোন। তাদের বাড়ি উপজেলার মনিগ্রাম নতুন পাড়া। দুই রুম বিশিষ্ট আধা পাঁকা টিন সেট ঘরের এক রুমে থাকে ভাই-বোন মিলে আর আরের রুমে থাকেন মা-বাবা। বাবার নাম আব্দুস সামাদ।

উপজেলার মনিগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু মনোয়ার হোসেন জানান, তার প্রতিষ্ঠান থেকে ১৪৭ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাশ করেছে ১৩৬ জন। গোল্ডেন এপ্লাস সহ জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৭ জন। তাদের মধ্যে গোল্ডেন এপ্লাস পাওয়া দরিদ্র পরিবারের যমজ দুই ভাই।

শাহদৌলা সরকারি কলেজের প্রভাষক আব্দুল হানিফ মিঞা বলেন, ফলাফল ভালো করে শুধু মা-বাবারই নয়, প্রতিষ্ঠানের মুখ উজ্জল করেছে। তবে প্রবল ইচ্ছা শক্তি থাকলেও ভবিষৎতে অর্থের কাছে হার মানতে পারে হত দরিদ্র মেধাবীরা। তাদের মেধাকে কাজে লাগাতে হলে কোন সুহৃদয় ব্যক্তিকে এগিয়ে আসা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2020  E-Kantha24
Technical Helped by Titans It Solution